ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক নাসের হুসেইন তো প্লেয়িং উইথ ফায়ার অটোবায়োগ্রাফিতে গফকে নিয়ে লিখেছিলেন, ‘গফ আমার ট্রাম্পকার্ড ছিল, সে আমাদের জন্য বোথাম ছিল।’ নব্বই দশকে পেস বোলিংয়ে আলো ছড়ানো পেসার ক্রিকেট ছাড়ার পর কোচিং, রিয়েলিটি নাচের শো, রেসলিংয়ের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ধারাভাষ্যকার হিসেবেও কাজ করছেন। গত বছর নেপাল প্রিমিয়ার লিগের (এনপিএল) ধারাভাষ্য দিতে এসেছিলেন গফ। এবার এসেছেন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল)।
২০০৩ সালের পর এবারই প্রথম বাংলাদেশে এসেছেন ইংল্যান্ডের হয়ে ৫৮ টেস্ট, ১৫৯ ওয়ানডে এবং ২ টি-টোয়েন্টি খেলা সাবেক পেসার। দ্বিতীয়বার বাংলাদেশে এসে সিলেটের প্রেমে মজেছেন তিনি। বিপিএল ছাড়ার আগে তাই হতাশা প্রকাশ করেছেন। ক্রিকেট ক্যারিয়ারে সুইংয়ের পাশাপাশি রিভার্স সুইংয়েও বেশ দক্ষ ছিলেন গফ। ক্রিকফ্রেঞ্জির সঙ্গে আলাপকালে তিনিই জানিয়েছেন, খুব সম্ভবত প্রথম ইংলিশ পেসার হিসেবে রিভার্স সুইংটা আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন তিনি। পরের লাইনে কথাটা একটু ঘুরিয়ে বললেন, প্রথম ইংলিশ পেসার না হলেও অন্তত রিভার্স সুইংয়ে তিনি মাষ্টারই ছিলেন।
সেই গফকে মুগ্ধ করেছেন বাংলাদেশের পেসাররা। বিপিএলে গফের সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন নাহিদ রানা, হাসান মাহমুদ ও রিপন মণ্ডল। ক্রিকফ্রেঞ্জির সঙ্গে আলাপে তাদের প্রশংসাই করলেন গফ। প্রথমবার বিপিএলে ধারাভাষ্য দিতে এসে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না (রিভার্স সুইং করতে না পারার জন্য বাংলাদেশের পেসারদের ঘাটতি কোথায়)। বরং বাংলাদেশের বোলারদের দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। হাসান মাহমুদ, রিপন মণ্ডল এবং নাহিদ রানা— এই তিনজন আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে।’
একটা সময় একজন কিংবা দুজন পেসার নিয়ে খেলতো বাংলাদেশ। যাদের বেশিরভাগই আবার মিডিয়াম পেসার। তবে সেই চিত্রটা বদলে গেছে সবশেষ কয়েক বছরে। মুস্তাফিজুর রহমান, তাসকিন আহমেদরা ছিলেন আগে থেকেই। তাদের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন তানজিম হাসান সাকিব, রিপন, শরিফুল ইসলামরা। বাংলাদেশ যে এখন পেস বোলারদের খনি হয়ে উঠেছে সেটা চোখ এড়ায়নি গফের। লম্বা সময় ইংল্যান্ডের হয়ে খেলা গফ বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের এখন জাতীয় দলে খেলার মতো ৮-৯ জন পেসার আছেন।
গফ বলেন, ‘এখন বাংলাদেশে পেসার বোলারদের একটা ভাণ্ডার তৈরি হয়েছে। তাসকিন ও সাকিবের (তানজিম) অভিজ্ঞতা আছে। শরিফুল ও মুস্তাফিজের মতো দুজন বাঁহাতি পেসার আছে। সাইফউদ্দিনও ভালো অলরাউন্ডার, লোয়ার অর্ডারে ভালো হিট করতে পারে এবং স্লোয়ার বলের ব্যবহারে পটু। এ ছাড়া তরুণদের সবারই দারুণ গতি ও বৈচিত্র্য রয়েছে। একটা সময় বাংলাদেশে শুধু দুজন পেসার থাকতো। এখন আর সেই দিন নেই। বরং ৭-৮-৯ জন পেসার আছে যারা কিনা এখনই জাতীয় দলে খেলার সামর্থ্য রাখে।’
বাংলাদেশের পেস বোলিং ইউনিটের নেতা হয়ে উঠেছেন মুস্তাফিজ। অভিষেকের পর থেকেই সবাইকে অবাক করে চলেছেন বাঁহাতি এই পেসার। মুস্তাফিজের বোলিংয়ের মূল অস্ত্র কাটার, স্লোয়ার আর সুইং। বিশেষ করে কাটারে প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের নিয়মিতই বোকা বানান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক দশক খেলে ফেললেও তাকে পড়তে এখনো কঠিন হয় ব্যাটারদের। কদিন আগে ইন্টারন্যাশনাল লিগ টি-টোয়েন্টিতে রীতিমতো জাদু দেখিয়েছেন। স্লোয়ার আর কাটারের মিশেলে বিপিএলেও আলো ছড়াচ্ছেন মুস্তাফিজ।
বাংলাদেশের পেসারকে নিয়ে গফের আনন্দটাও একটু বেশিই। স্লোয়ার ও কাটারের সংমিশ্রণে করা ডেলিভারিতে গফ নাম দিয়েছেন ফিজ বল। উদাহরণ টেনেছেন সাউথ আফ্রিকার পল অ্যাডামস ও দুনিয়ার খ্যাতনামা স্পিনার শ্রীলঙ্কার মুত্তিয়া মুরালিধরনেরও। বাঁহাতি পেসারে মুগ্ধ হয়ে গফ বলেন, ‘মুস্তাফিজ তো অবিশ্বাস্য। আমি জানি না সে ফিজ বলটা (স্লোয়ার কাটার) কিভাবে করে। তাঁর অফ কাটার তো আছেই কিন্তু ফিজ বলটা বুঝতে হলে আপনাকে তাঁর হাতের দিকে খুব ভালোভাবে খেয়াল করতে হবে। অনেকটা মুরালির মতো।’
‘অ্যাডামসের কথা মনে আছে? সাউথ আফ্রিকার হয়ে খেলেছিলেন। আপনাকে হাতের দিকে খুবই ভালো করে তাকাতে হয়েছে। আপনি যদি সেটা পড়েও ফেলেন তবুও খেলাটা কঠিন। কারণ এটা একেবারে ন্যাচারাল। বল নিচু হয়ে আসে আবারও অনেক পিচে বাড়তি বাউন্স পায়। যেটা বললাম আপনি তাঁর বলটা বুঝতে পারলেও খেলাটা কঠিন। অনেকবারই সে এটা প্রমাণ করেছে, এমনকি এই টুর্নামেন্টেও সেটা প্রমাণ করছে। যেকোন দলের জন্যই সে একটা সম্পদ।’
গতিময় বোলিং দিয়ে প্রথমবার আলোচনায় আসেন নাহিদ রানা। জাতীয় ক্রিকেট লিগ (এনসিএল), বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) পেরিয়ে জাতীয় দলেও জায়গা করে নিয়েছেন ডানহাতি এই পেসার। চাঁপাইনবাবগঞ্জ উঠে আসা নাহিদ প্রতি ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বোলিং করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। রংপুর রাইডার্সের হয়ে খেলা পেসারকে নিয়ে মুগ্ধতার কথা জানাতে গিয়ে যখন জেনেছেন তিনি বিশ্বকাপ দলে নেই তখন খানিকটা অবাকই হয়েছেন।
গফ বলেন, ‘নাহিদ রানাকে মনে ধরেছে। অবিশ্বাস্য গতি। তরুণ হিসেবে সে দারুণ প্রতিভাবান। ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারে। যেকোন বোলারই এমন গতিতে বল করতে পারলে সে যেকোন ফরম্যাটেই সফল হতে পারে—হোক সেটা টেস্ট, টি-টোয়েন্টি বা ওয়ানডে। বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি দলে তাকে না দেখে আমি কিছুটা অবাকই হয়েছি। আমার মনে হয় বাংলাদেশের স্কোয়াড বেশ শক্তিশালী। তবে ১৫০ কিমি গতিতে বল করতে পারে এমন কাউকে দলে রাখাটা দারুণ সংযোজন হতে পারত। দলে অনেক অভিজ্ঞ বোলার আছে যাদের গতি প্রায় একই রকম। তাদের মাঝে সত্যিকারের দ্রুতগতির একজন থাকলে ভালো হতো।’
বিশ্বকাপ দলে না থাকলেও চলতি বিপিএলে ব্যাট হাতে ছন্দে আছেন নাজমুল হোসেন শান্ত। টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী দিনেই সেঞ্চুরি করেছিলেন বাঁহাতি এই ব্যাটার। যদিও মাঠে বসে সেটা দেখার সুযোগ হয়ে উঠেনি গফের। তবে সবশেষ কয়েকটা ম্যাচে তাকে ধারাভাষ্য কক্ষে বসে দেখেছেন ইংলিশ গ্রেট। একটি করে সেঞ্চুরি ও হাফ সেঞ্চুরিতে ৮ ম্যাচে ২৯২ রান করেছেন শান্ত। বিপিএলের সিলেট পর্ব শেষে এখনো পর্যন্ত তিনিই সবচেয়ে রানের মালিক। গফ মনে করেন, শান্ত বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়ার দাবি রাখেন।
তিনি বলেন, ‘শান্ত দুর্দান্ত একজন খেলোয়াড়। তাঁর খেলা দেখতে আমার ভালোই লাগে। তবে বাংলাদেশের স্কোয়াডের দিকে তাকালে মনে হয় দলটা প্রায় আপনাআপনিই নির্বাচিত হয়ে যায়। আমি যদি বাস্তবিকভাবে চিন্তা করি তাহলে শান্ত এবং নাহিদ, দুজনই প্রস্তুত। আমি জানি শান্ত আগেও ছিল, তবে সে এখন দারুণ খেলছে এবং খেলাটা উপভোগ করছে। রাজশাহী ওয়ারিয়র্সকে খুব ভালোভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সেঞ্চুরি করেছে, বেশ কিছু বড় স্কোরও আছে। সে কিছুটা বোলিংও করতে পারে। আমার কাছে এই দুজনই (শান্ত ও নাহিদ) তাই বিশেষভাবে নজর কেড়েছে এবং বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা পাওয়ার দাবি রাখে।’
পাকিস্তান সুপার লিগের (পিএসএল) সবশেষ আসরে লাহোর কালান্দার্সের প্রধান কোচের দায়িত্বে ছিলেন গফ। ইংলিশ গ্রেটের কোচিংয়ে পিএসএলে চ্যাম্পিয়ন হয় লাহোর। সেই টুর্নামেন্টে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির হয়ে খেলেছেন সাকিব আল হাসান, মেহেদী হাসান মিরাজ ও রিশাদ হোসেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন ড্রাফট থেকে দল পাওয়া রিশাদ। ডানহাতি লেগ স্পিনার ৭ ম্যাচে নিয়েছিলেন ১৩ উইকেট। এমন পারফরম্যান্স মুগ্ধ করেছে গফকে।
বিপিএল বাদ দিয়ে হোবার্ট হারিকেন্সের হয়ে বিগ ব্যাশ খেলা রিশাদকে নিয়ে গফ বলেন, ‘লাহোর কালান্দার্সে সে দারুণ করেছিল। আমরা তাকে দলে নিয়েছিলাম কিন্তু সে শুরু থেকে খেলার সুযোগ পায়নি। কিন্তু টুর্নামেন্টের শেষ দিকে সে যখন সুযোগ পেয়েছিল তখন দারুণ করেছিল। সে চমৎকার বোলার এবং ভালো ব্যাটারও। ভালো ব্যাপার হচ্ছে সে বড় শটও খেলতে পারে। এজন্যই সে বিগ ব্যাশে খেলছে। এখন বিশ্বের অনেক ফ্র্যাঞ্চাইজি দল তাকে পেতে চাইবে।’
রিশাদ বাংলাদেশের পরবর্তী সুপারস্টার হবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ইংলিশ গ্রেট আরও যোগ করেন, ‘তাঁর (রিশাদ) সামনে দারুণ একটা মঞ্চ (বাংলাদেশের পরবর্তী সুপারস্টার) প্রস্তুত হয়ে আছে। সামনেই তো বিশ্বকাপ। সে যদি বিশ্বকাপে ভালো করে এবং বাংলাদেশ যদি বড় কোন দলকে হারিয়ে অঘটন ঘটিয়ে তাহলে তাঁর নাম বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। মানুষ তো এখনই তাকে নিয়ে কথা বলছে। দেখা যাক সামনে কী হয়।’