দুজন মিলে প্রথম দিনেই এনে দিয়েছিলেন ৪০৫ রান। দ্বিতীয় দিনের সকালে তাদের দুজনের ৪১৫ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙে বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে স্মিথ ২৩২ এবং ম্যাকেঞ্জি আউট হয়েছিলেন ২২৬ রানের ইনিংস খেলে। মাহেলা জয়াবর্ধনে কিংবা কুমার সাঙ্গাকারার মতো কিংবদন্তি ব্যাটাররাও বাংলাদেশকে পেলেই ‘অমানবিক’ হয়ে উঠতেন। তবে সবশেষ কয়েক বছরে টেস্টে ক্রিকেটে বাংলাদেশের দৃশ্যপট কিছুটা বদলে গেছে।
ঢাকা টেস্টে পাকিস্তানকে অবিশ্বাস্যভাবে হারানোর পরও নাজমুল হোসেন শান্ত মাটিতে পা রাখলেন। সহজাত ভাষায় বললেন, আমরা এখনো অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ড হয়ে যাইনি। কথাটা একদমই ভুল বলেননি। তবে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের যে উন্নতি হয়েছে সেটাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রথম ১১২ ম্যাচে বাংলাদেশ জয় পেয়েছিল ১৩ টেস্টে। অথচ পরের ১৩ টেস্ট জিততে বাংলাদেশের লেগেছে ৪৫ ম্যাচ।
বাংলাদেশ সবশেষ তিন টেস্টের সবকটিতে জয় পেয়েছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও চিত্রটা একই। রাওয়ালপিন্ডিতে দুই টেস্ট জয়ের পর প্রথমবারের ঘরের মাঠে পাকিস্তান বধ। বাংলাদেশের এমন বদলে যাওয়ার পেছনে বড় অবদান বোধহয় তাসকিন আহমেদ, নাহিদ রানা, খালেদ আহমেদসহ বাকি পেসারদের। বাকিদের যে নেই সেটা নয়। তবে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তগুলোতে একটা ব্রেক থ্রু কিংবা একটা স্পেলে কাজটা এগিয়ে দিয়েছেন তারা।
একটা সময় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট মানেই একাদশে একগাদা স্পিনার। একাদশে একজন পেসার থাকলেও তার কাজ ছিল শুধু বলটা পুরনো করে স্পিনারদের হাতে তুলে দেওয়া। ২০১৯ সালে তো আফগানিস্তানের বিপক্ষে পেসার ছাড়াই খেলতে নেমেছিলেন মুমিনুল হকরা। সেই বাংলাদেশই এখন একাদশে তিন পেসার নিয়ে খেলতে নামে, উইকেটে ঘাস রাখে, স্পোর্টিং উইকেটের সাহসও করে।
মুশফিকুর রহিম কোনো রাখঢাক না রেখে সরাসরি বলেই দিলেন বাংলাদেশের এখন ২০ উইকেট নেওয়ার সক্ষমতা আগের চেয়ে বেশি। দ্বিতীয় টেস্টের আগে ডানহাতি ব্যাটার বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় টেস্ট ক্রিকেটে বিশেষ করে আমাদের বোলিং বিভাগে একটু ঘাটতি ছিল। হয়তবা বলতে পারেন আমাদের পেস বোলাররা তরুণ কিন্তু আমি তরুণ শব্দটা ওই দিক থেকে বলি না। কারণ আপনি টেস্ট খেললেই অভিজ্ঞ হয়ে যাবেন বিষয়টা এমন নয়। আপনি যদি এখন পর্যন্ত রানাকে দেখেন ও কিন্তু অনেক বছর ক্রিকেট খেলছে। টেস্ট ক্রিকেটে হয়ত নতুন, ও কিন্তু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট, জাতীয় দল বা অন্য পর্যায়ে ক্রিকেট খেলেছে।
‘অভিজ্ঞতার দিক থেকে টেস্টে বিশেষ করে আমাদের বোলিং বিভাগের ২০ উইকেট নেওয়ার সক্ষমতা আগের চেয়ে ভালো। স্পিনাররা তো বরাবরের মতোই আমাদের সবসময় ভালো ছিল। কিন্তু বোলিং বিভাগে যখন এই অস্ত্রটা যুক্ত হয় যায় তখন নিশ্চিতভাবেই আমার মনে হয় আমরা ব্যাটাররা যদি ধারাবাহিকভাবে খেলতে পারি যেটা কিনা গত তিন-চার বছরে খুব ভালো হচ্ছে টেস্ট ক্রিকেটে। সেদিক থেকে বলব এটা একটা আশীর্বাদ এবং অধিনায়কের জন্য একটা বড় স্বস্তির বিষয়।’
২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক ছিলেন মুশফিক। ওই সময় তার অধীনে ৩৪ টেস্টে ৭ জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। দেশের টেস্ট অধিনায়কের জয়ের হিসেবে শান্তর সঙ্গে যৌথভাবে সবার উপরে তিনি। মুশফিকের সময়টাতে বেশিরভাগ সময়ই প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট নিতে হাঁসফাঁস করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। ডানহাতি ব্যাটার নিজেই জানালেন, তার সময়ে ব্যাটার থাকলেও ২০ উইকেট নেওয়ার মতো ওরকম ৪ বোলার ছিল না।
মুশফিক বলেন, ‘আমি যখন অধিনায়ক ছিলাম তখন হয়তবা আমার কাছে ব্যাটার ছিল কিন্তু ২০ উইকেট নেওয়ার মতো ওরকম ৪ জন বোলার ছিল না। আমার কাছে হয়তবা এক বা দুইজন ছিল। আমার জন্য কঠিন হয়ে যেতো। এখন আমি একটা জিনিস বলতে পারি যে আমাদের দলের ভারসাম্য এবং বৈচিত্র্য অনেক বেশি। যেটা কিনা যেকোনো একটা টেস্ট দলকে যেকোনো পরিস্থিতিতে সেটা স্পিন, পেস কিংবা স্পোর্টিং উইকেট হোক—আপনাকে ফলাফল বের করতে সুবিধা করে দেবে। শুধু আমাদের প্রয়োগটা করতে হবে নির্দিষ্ট ওই পাঁচ দিনে।’
নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুতে টেস্ট জয়, রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তান ও দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের মতো দলকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। বড় কিছু জয় এলেও টেস্টে এখনো ধারাবাহিক হয়ে উঠতে পারেনি টাইগাররা। মুশফিক নিজেও সেটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। ডানহাতি ব্যাটারের বিশ্বাস, ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে টেস্ট দল হিসেবে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে যাবে।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি উন্নতিটা এখনো পর্যন্ত খুবই ভালো। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা হলো ধারাবাহিকতা। আমার মনে হয় দল হিসেবে আমরা যদি এটা ধরে রাখতে পারি পরবর্তী দুই-তিন বছর তাহলে আমাদের টেস্ট দল আরও ভালো একটা অবস্থানে যাবে।’