শরিফুলের ৬ উইকেট, তবুও পিছিয়ে বাংলাদেশ

অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ সিরিজ
বাংলাদেশের দ্বিতীয় পেসার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৬ উইকেট নিয়েছেন শরিফুল ইসলাম
বাংলাদেশের দ্বিতীয় পেসার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৬ উইকেট নিয়েছেন শরিফুল ইসলাম
ক্রিকফ্রেঞ্জি ডেস্ক
ক্রিকফ্রেঞ্জি ডেস্ক
শরিফুল ইসলাম যখন মাঠ ছেড়ে ড্রেসিং ‍রুমের পথে হাঁটছেন সতীর্থ সবাই তখন হাততালিতে অভিবাদন জানাচ্ছিলেন। ধারাভাষ্যকার তখন বললেন, ‘শরিফুল স্টার্কের পথই অনুসরণ করেছেন।’ সত্যিকার অর্থেই সেটা করতে পেরেছেন বাংলাদেশের তারকা পেসার। সকালের শুরুতে উইকেটের সুবিধা পেয়েছেন, সেটাও কাজেও লাগিয়েছেন মিচেল স্টার্ক। আগুনে বোলিংয়ে বাংলাদেশকে থামিয়েছেন ৬৪ রানে। অস্ট্রেলিয়ান পেসারের একার শিকার ছয় উইকেট।

স্টার্কের খরচা মাত্র ১২ রান, নিয়েছেন ছয়টা মেইডেনও। শরিফুল অবশ্য স্টার্কের মতো পুরোপুরি সুবিধা পেলেন না। তবে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং অর্ডারকে গুঁড়িয়ে দিতে যা করা প্রয়োজন ছিল সেটাই করেছেন। স্টিভ স্মিথ, মার্নাস ল্যাবুশেন, ট্রাভিস হেডের মতো ব্যাটারকে নিজের শিকার বানিয়েছেন। স্টার্কের মতো বাংলাদেশের পেসারও নিয়েছেন ৬ উইকেট। তবে দিনশেষে ব্যাটারদের ব্যর্থতাই বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ৮ উইকেটে ১৬৫ রান তোলায় প্রথম ইনিংসে ১০১ রানে পিছিয়ে রয়েছে সফরকারীরা।

বাংলাদেশকে ৬৪ রানে অল আউট করে প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটা ভালো করতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। জেইক ওয়েদার‌্যান্ডের জায়গায় সুযোগ পেয়ে সেটা কাজে লাগাতে পারেননি ম্যাট রেনশ। তাসকিন আহমেদের গুড লেংথ ডেলিভারিতে ফ্লিক করতে চেয়েছিলেন বাঁহাতি ওপেনার। তবে লিডিং এজ হয়ে স্লিপে তানজিদকে ক্যাচ দিয়েছেন ৮ রানে। আরেক ওপেনার ট্রাভিস হেড খানিকটা আক্রমণাত্বক খেলার চেষ্টা করেছিলেন।

যদিও খুব একটা স্বস্তিতে ছিলেন না তিনি। বোলিংয়ে পরিবর্তন এনে হেডকে ফেরায় বাংলাদেশ। শরিফুল ইসলামের ভেতরে ঢোকা ডেলিভারিতে ইনসাইড এজে বোল্ড হয়েছেন হেড। প্রথম টেস্টেও প্রায় একইভাবে আউট হয়েছেন তিনি। ২৭ বলে ২২ রান করেছেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার। একই ওভারে মার্নাস ল্যাবুশেনকেও ফেরান শরিফুল। বাংলাদেশের পেসারের বল ল্যাবুশেনের থাই প্যাডে লেগে স্টাম্পে আঘাত হানে।

আবারও ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে। ৪১ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন স্মিথ ও গ্রিন। তারা দুজনে মিলে ওয়ানডে মেজাজে রান তুলতে থাকেন। স্মিথকে ফিরিয়ে জমে ওঠা জুটি ভাঙেন শরিফুল। বাঁহাতি পেসারের লেংথ ডেলিভারিতে লেগ বিফোর উইকেট হয়েছেন স্মিথ। ৭৪ বলে ৪২ রান করেছেন অস্ট্রেলিয়ান গ্রেট। প্রথমবার বোলিংয়ে এসেই বাংলাদেশকে উইকেট এনে দেন মেহেদী হাসান মিরাজ।

ডানহাতি অফ স্পিনারের বলে বড় শট খেলতে গিয়ে মিড অনে ক্যাচ দেন অ্যালেক্স ক্যারি। নিজের পঞ্চাশতম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান উইকেটকিপার। পরের ওভারে তৃতীয় বলে বেউ ওয়েবস্টারকে লেগ বিফোর উইকেটের ফাঁদে ফেলেন শরিফুল। একই ওভারে ফিরিয়েছেন প্যাট কামিন্সকেও। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ককে ফিরিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথমবার পাঁচ উইকেট পেয়েছেন শরিফুল।

এ ছাড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় পেসার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন তিনি। নিজের পরের ওভারে শরিফুল ফেরান মিচেল স্টার্ককে। বাঁহাতি পেসারের ভেতরে ঢোকা ডেলিভারিতে বোল্ড হয়েছেন তিনি। শেষ বিকেলে ৮০ বলে হাফ সেঞ্চুরি করেছেন ক্যামেরন গ্রিন। নাথান লায়নকে সঙ্গে নিয়ে দিনের খেলাটাও শেষ করেছেন ডানহাতি এই ব্যাটার। বাংলাদেশের হয়ে ৩৫ রানে ৬ উইকেট নিয়েছেন শরিফুল। একটি করে উইকেট পেয়েছেন তাইজুল ও মিরাজ।

এর আগে ম্যাকাইয়ের পেস-সহায়ক কন্ডিশনে দিনের প্রথম সেশনে পেসাররা বাড়তি সুবিধা পাবেন সেটা জানা কথাই ছিল। পিচ কিউরেটর পিটার কাজাকফও তেমন পূর্বাভাসই দিয়েছিলেন। কারও কারও চোখে ম্যাকাইয়ের উইকেট অনেকটা গ্যাবার মতো। প্রথম ঘণ্টায় যেন পেস আর বাউন্সে পেসারদের স্বর্গই হয়ে রইল। উইকেট থেকে বাড়তি সুবিধা পেলেন, মিচেল স্টার্ক সেটা কাজেও লাগালেন। শুরুটা করলেন একদম ইনিংসের প্রথম বল থেকেই।

বাঁহাতি পেসারের ও ইনিংসের প্রথম বলেই ফেরেন সাদমান ইসলাম। স্টার্কের মিডল অ্যান্ড লেগ স্টাম্পের ফুলার লেংথ ডেলিভারিতে লিডিং এজে ক্যাচ দিলেন গালিতে থাকা ক্যামেরন গ্রিনকে। সাদমান ফেরেন ডাক মেরে। ক্যারিয়ারে চতুর্থবারের মতো ইনিংসের প্রথম বলেই উইকেট নিয়েছেন কীর্তি। প্রথম দিনের প্রথম ওভারে স্টার্ক উইকেট নিয়েছেন নয়বার। পেছনে ফেলেছেন ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি জেমস অ্যান্ডারসনকে (৮)।

পরের ওভারে বোলিংয়ে এসে তুলে নেন তানজিদ হাসান তামিমের উইকেট। বাঁহাতি পেসারের অফ স্টাম্পের বাইরের ফুলার লেংথ ডেলিভারিতে আলগা শটে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি। ডারউইনের প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরির পর টানা দুই ডাক মেরেছেন বাঁহাতি ওপেনার। পরের বলে আউট হয়েছেন নাজমুল হোসেন শান্তও। স্টার্কের ফুলার লেংথ ডেলিভারিতে লেগ বিফোর উইকেট হয়েছেন। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি বাংলাদেশের অধিনায়ক। টিভি রিপ্লেতে দেখা যায় অল্পের জন্য বল স্টাম্পে লেগেছে।

আম্পায়ার্স কলে কাটা পড়ায় সিদ্ধান্ত নিয়ে মোটেও খুশি ছিলেন না শান্ত। হ্যাটট্রিকের সুযোগ তৈরি হলেও স্টার্ককে সেটা করতে দেননি মুশফিকুর রহিম। অস্ট্রেলিয়ান পেসারের পরের ওভারে আউট হন মুমিনুল হকও। তিনিও তানজিদের মতো প্রায় একই শটে আউট হয়েছেন। শূন্য রানে জীবন পেয়েছিলেন লিটন দাস। স্টার্কের বাউন্সারে স্লিপে ক্যাচ ছেড়েছিলেন বেউ ওয়েবস্টার। যদিও সেটা কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। বরং পরের বলেই লেগ বিফোর উইকেট হয়েছেন।

তানজিদের মতো লিটনও টানা দুই ইনিংসে ডাক মেরেছেন। লিটনকে ফিরিয়ে মাত্র ২২ বলে ৫ উইকেট তুলে নেন স্টার্ক।একপ্রান্ত আগলে রেখে উইকেটে টিকে থাকার চেষ্টা করেছিলেন মুশফিক। খানিকটা সময় সেটা পেরেছিলেনও। তবে মুশফিকের প্রতিরোধ ভাঙেন প্যাট কামিন্স। ডানহাতি পেসারের ফুলার লেংথে পড়ে ভেতরে ঢোকা ডেলিভারিতে বোল্ড হন তিনি। ৪২ বল খেলে অভিজ্ঞ ব্যাটার আউট হন ৫ রানে। স্টার্কের ছোঁবলে দুঃস্বপ্নের একটা সেশন পার করে সফরকারীরা।

৬ উইকেটে ৩৫ রান তোলা বাংলাদেশ লাঞ্চ থেকে ফিরেই হারায় মেহেদী হাসান মিরাজের উইকেট। কামিন্সের বলে ক্যাচ দিয়েছেন স্লিপে। আউট হয়েছেন ৫১ বলে ১১ রান করে। একটু পর জশ হ্যাজেলউডের বলে লেগ স্লিপে ক্যাচ দেন হাসান মাহমুদ। তিনি ফেরেন ৩৬ বলে ১০ রান করে। ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪৩ রানে অল আউট হয়েছিল বাংলাদেশ। ম্যাকাইতে সেই রেকর্ড ভাঙার উপক্রম হয়েছিল সফরকারীদের। যদিও সেটা হতে দেননি শরিফুল ইসলাম।

কামিন্সের বলে চার মেরে বাংলাদেশকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছেন। পরবর্তীতে চার মারেন তাইজুল নিজেও। পরের ওভারে কামিন্সকে টানা দুই চার মেরে বাংলাদেশের পঞ্চাশ পূরণ করেন শরিফুল। তিন চারে বাঁহাতি ব্যাটার আউট হয়েছেন ১৪ রানে। বাংলাদেশের ইনিংস এটাই সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। সফরকারীরা শেষ পর্যন্ত অল আউট হয়েছে ৬৪ রানে। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১০ ওভারে ৬ মেইডেনসহ ১২ রান খরচায় স্টার্ক একাই নিয়েছেন ৬ উইকেট। তিনটি উইকেট পেয়েছেন কামিন্স।

আরো পড়ুন: