২০২৩ সালের আগষ্ট থেকেই রাওয়ালপিন্ডিতে কারাবন্দী তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে ইমরানের শারীরিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গত ফেব্রুয়ারিতে ইমরানের সুচিকিৎসার জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে চিঠি দিয়েছিলেন ১৪ জন সাবেক অধিনায়ক। কদিন আগে বিভিন্ন দেশের ২১ অধিনায়ক আবারও চিঠি দিয়েছেন। তবে এখনো পর্যন্ত ইমরানের অবস্থার উন্নতি হয়। পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটাররাও আওয়াজ তুলতে শুরু করেছেন।
জাভেদ মিয়াঁদাদ তো ইমরানের মুক্তি চেয়ে আবেগ ধরে রাখতে না পেরে কান্না করে দিয়েছেন। মঈন খানও দেশটির সাবেক অধিনায়ক ও প্রধানমন্ত্রীর মুক্তি চেয়েছেন। এবার তাদের সঙ্গে যুক্ত হলেন সৈয়দ আশরাফুল হক। ইমরানের সঙ্গে বন্ধুত্বের নানান স্মৃতিচারণ করে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটার ও বিসিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। পাশাপাশি তার মুক্তির জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
সৈয়দ আশরাফুল হকের পুরো বিবৃতি তুলে ধরা হলো:
“ইমরান খান পুরো বিশ্ব জুড়ে একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্যে ছিল পাকিস্তান থেকে দুর্নীতি নিমূল করা। দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জনগণের স্পষ্ট ম্যান্ডেট বা গণরায়ও তাঁর পক্ষে ছিল। এমন একজন মানুষকে অমানবিকভাবে কারাগারে বন্দী করে রাখা বিশ্ববাসী চায় না, এমনকি কোনো সভ্য জাতিও এমন কিছু চায় না। মানবাধিকারের দিক থেকে এটি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অসাংবিধানিক। ইমরান খানের সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করা হচ্ছে এটা পুরোপুরি বর্বরতার শামিল।
১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আমি ইমরান খানকে চিনি। তখন লাহোর অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ঢাকায় খেলতে এসেছিল। তখন সে বেশ তরুণ ছিলেন। আমার মনে আছে সে আমাদের বিপক্ষে একটি সেঞ্চুরিও করেছিল। ওই ম্যাচেই আমাদের দুজনের বন্ধুত্ব। এরপর থেকে আমরা সবসময় যোগাযোগ রেখেছি।
স্বাধীনতার পর আমরা দুজন যখন ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করছিলাম তখন দেখা করতাম। আমি প্রায়শই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবল কলেজে তার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। সেখানে সে মাঝে মাঝে হকিও খেলতো। পাকিস্তান যখন ভারতে টেস্ট সিরিজ খেলতে যেতো তখন তার সঙ্গে দেখা করার জন্য ভারতে গিয়েছি। বিশ্বের অন্যপ্রান্তেও আমাদের দুজনের দেখা হয়েছে। সে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পরও আমাদের বন্ধুত্ব একই রকম ছিল।
পরবর্তী বছরগুলোতে যখনই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে তখনই রাজনৈতিক কারণে আমি তার জীবন নিয়ে ভয়ে থাকতাম। তবে আল্লাহভীরু একজন মানুষ হিসেবে সে আমাকে সবসময় বলতেন, ‘অ্যাশ, আমার যদি এভাবেই মৃত্যু লেখা থাকে তাহলে আমি এভাবেই মরব। তুমি আমাকে বাঁচাতে পারবে না। এমনকি কেউই আমাকে বাঁচাতে পারবে না। এটা পুরোপুরি আল্লাহর ইচ্ছা। কোনো গুলিতে যদি আমার নাম লেখা থাকে তাহলে সেটা আমার শরীরে লাগবেই। তাহলে আমার নিজের জীবনবোধ ও নীতির কথা ভুলে কেন আমি এসব নিয়ে চিন্তা করব?
আমার এখনো মনে আছে, পাকিস্তানের প্রথম রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনিই প্রথম ১৯৭১ সালের সমস্ত নারকীয় অপরাধ ও নৃশংসতার জন্য তাদের ক্ষমা চাইতে বলেছিলেন।
বহুবার আমি তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছি। ১৯৯০ এর দশকে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে আমরা সবাই মিলে নৌকা ভ্রমণ করতাম। এগুলো এখনো আমার মনে আছে। ইমরান চাইলে পরিবার নিয়ে সুন্দর একটা জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু সে তার আদর্শ ও নীতির কারণে এসব কিছুই ত্যাগ করেছেন।
সে পাকিস্তানের জন্য ভালো কিছু করতে চেয়েছিলেন। বর্তমানে তার সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করা হচ্ছে এটা পুরোপুরি অমানবিক। পুরো বিশ্ব জুড়ে তাকে নিয়ে সবার প্রতিবাদ, প্রতিক্রিয়া কিংবা ক্ষোভগুলো লক্ষ্য করুন— সবাই একই কথা বলছে, যা হচ্ছে এটা একদমই ঠিক হচ্ছে না। আমার মনে হয় সে যেন স্বস্তি পায় বা মুক্তি মেলে সেটার জন্য আমাদের সবারই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কিছু একটা করা উচিত।”