আইসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জোগ গুপ্ত মনে করেন,শুধু নিয়মরক্ষার দ্বিপাক্ষীয় সিরিজ আয়োজন করে ওয়ানডে ক্রিকেটকে টিকিয়ে রাখা কঠিন। প্রতিটি সিরিজের সঙ্গে নির্দিষ্ট লক্ষ্য, প্রতিযোগিতার আবহ ও দর্শকদের আগ্রহ জড়িত থাকা প্রয়োজন। এসব নিশ্চিত করতে হলে সদস্য দেশগুলোকেও যথেষ্ট আর্থিক ও অন্যান্য সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে।
গত বছরের জুলাইয়ে আইসিসির প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নেওয়া গুপ্ত ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে বলেন, 'এলোমেলাভাবে আয়োজন করা দ্বিপাক্ষিক সিরিজের যুগ শেষ করতে হবে। কারণ নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সংস্কৃতি, প্রতিযোগিতা ও তীব্র লড়াই ছাড়া কোনো দেশই ক্রিকেটকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না। এসব নিশ্চিত করতে আর্থিক ও অন্যান্য দুই ধরনেরই বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।'
ওয়ানডে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী গুপ্ত। তার মতে, ৫০ ওভারের ক্রিকেটের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখনো জায়গা রয়েছে। তবে এই সংস্করণকে আরও কার্যকর করতে হলে এর উদ্দেশ্য কী হবে এবং ভবিষ্যতে এটি কোন পথে এগোবে, সেটি নতুন করে ঠিক করতে হবে।
গুপ্ত বলেন, 'দর্শকদের মনোযোগ ও সম্পৃক্ততা বাড়ায়—এমন চারটি বিষয়, অর্থাৎ নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সংস্কৃতি, প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে আমাদের মনোযোগ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ানডে শুধু টিকে থাকতে পারে তা নয়, এটি আরও ভালোভাবে এগিয়েও যেতে পারে।'
বিশ্বকাপের সঙ্গে ওয়ানডে ক্রিকেটের সম্পর্ক আরও শক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন আইসিসির প্রধান নির্বাহী। তার মতে, পুরুষ ও নারী দুই বিশ্বকাপই ৫০ ওভারের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে গুপ্ত বলেন, 'আমাদের ক্রিকেটের সামগ্রিক কাঠামোয় এই সংস্করণের জায়গা রয়েছে এবং সেটি পুরুষ ও নরী দুই বিশ্বকাপের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। ওয়ানডে ক্রিকেটকে আমরা কী হিসেবে দেখতে চাই এবং ভবিষ্যতে এটি কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে ভাবতে হবে। এর মধ্যে অংশগ্রহণের পরিধিও বিবেচনায় রাখতে হবে।'
গত কয়েক বছর ধরেই ওয়ানডে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। একদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টি-টোয়েন্টি লিগের বিস্তার ঘটছে, অন্যদিকে টেস্ট ক্রিকেট বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের মাধ্যমে পেয়েছে নির্দিষ্ট শিরোপার লড়াই। ফলে দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজে দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখার জন্য নতুন পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়েছে।
ওয়ানডেতে অবশ্য সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চ এখনো বিশ্বকাপ। ২০২৭ সালের অক্টোবরে-নভেম্বরে সাউথ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ায় বসবে পরবর্তী ওয়ানডে বিশ্বকাপ। ১৪ দলের এই টুর্নামেন্টে এবার কাঠামোগত পরিবর্তনও এনেছে আইসিসি। মূল পর্বের আগে থাকবে সুপার সিরিজ এবং সেমিফাইনালের আগে নতুন করে রাখা হয়েছে সুপার সেভেন পর্ব।
তবে বিশ্বকাপের নতুন কাঠামো নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। বাছাইপর্বে ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বরে থাকা তিন দলকে নিয়ে হবে একটি ত্রিদেশীয় সিরিজ। সেখান থেকে মাত্র একটি দল মূল পর্বে জায়গা পাবে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে স্কটল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের ক্রিকেট বোর্ড।
২০২৭ বিশ্বকাপ দিয়েই শুরু হবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নতুন ভবিষ্যৎ সফরসূচি বা এফটিপি চক্র। ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত চলবে এই চক্র। সদস্য দেশগুলোর দ্বিপাক্ষিক সিরিজের কাঠামোও তখন নতুন করে নির্ধারণ করা হবে। চলতি পুরুষদের এফটিপি শেষ হবে ২০২৭ সালের এপ্রিলে। নতুন চক্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের গণমাধ্যম স্বত্বের নতুন মেয়াদও শুরু হবে।
দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে এর আগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন সাউথ আফ্রিকার সাবেক অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথও। তার মতে, বিশ্বের শীর্ষ দলগুলোর মধ্যে না হলে দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেটে অনেক সময় দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখার মতো যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক কারণ থাকে না। সাবেক প্রোটিয়া ক্রিকেটার জন্টি রোডসও মনে করেন, ভবিষ্যতে ওয়ানডে ক্রিকেট চাপে পড়তে পারে।
মুম্বাইয়ের এক অনুষ্ঠানে রোডস বলেন, 'টি-টোয়েন্টি যখন শুরু হয়েছিল, তখন সবাই বলেছিল এটি টেস্ট ক্রিকেটের ওপর চাপ তৈরি করবে। আশ্চর্যজনকভাবে তা হয়নি। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে, আগামী দিনে ৫০ ওভারের ক্রিকেটই হয়তো সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।'
তবে ওয়ানডে ক্রিকেট পুরোপুরি হারিয়ে যাবে বলে মনে করেন না রোডস। তার মতে, বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে ৫০ ওভারের ক্রিকেটের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে দল ও সংস্করণের প্রতি সমর্থকদের আবেগও এই সংস্করণকে টিকিয়ে রাখতে পারে।
রোডস বলেন, 'আমরা সৌভাগ্যবান যে ৫০ ওভারের ক্রিকেটের এমন সমর্থক রয়েছে, যারা সংস্করণ যেটাই হোক, নিজেদের দলকে সমর্থন করে। আমার মনে হয়, ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে ৫০ ওভারের ক্রিকেটের সংখ্যা কমতে থাকবে। কিন্তু ৫০ ওভারের ক্রিকেট ছাড়া ক্রিকেটের কথা ভাবাও খুব কঠিন।'