চট্টগ্রামে সিরিজের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামার পর থেকেই রোমাঞ্চিত ছিলেন নিখিল। ফিল্ডিংয়ে নেমেই সৌম্য সরকারের দুর্দান্ত এক ক্যাচ ধরেন তিনি। এরপর দুই ওভার বল করে ১৪ রান খরচ করে নিজের বিগব্যাশ সতীর্থ রিশাদ হোসেনের উইকেট নেন তিনি। ব্যাট হাতেও খেলেন ১৩ বলে ১৮ রানের কার্যকরী ইনিংস।
ম্যাচের পর নিখিল বলেন, 'অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলার স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। প্রথম ক্যাচ নেওয়ার পর মনে হয়েছে আমিও আন্তর্জাতিক মঞ্চে কিছু করতে পারব।'
দলে ডাক পাবার অনুভূতি নিয়ে নিখিল বলেন, 'অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচকদের কাছ থেকে সিরিজের জন্য ডাক পাওয়ার খবরটি ছিল আমার জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোর একটি। তারপরও নিশ্চিত ছিলাম না আমি খেলতে পারব কি না। ম্যাচের আগের রাতে জানতে পারি যে আমি একাদশে আছি। তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা নার্ভাস লাগছিল।'
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ভারতীয় বংশোদ্ভূত কয়েকজন ক্রিকেটার অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিত্ব করলেও ভারতের মাটিতে জন্ম নেওয়া কোনো পুরুষ ক্রিকেটার ১৯৬৪ সালের পর জাতীয় দলে জায়গা পাননি। সেই বছর গুজরাটে জন্ম নেওয়া লেগস্পিনার রেক্স সেলার্স ভারতের বিপক্ষে কলকাতা টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলেছিলেন।
পাঞ্জাবের হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলা নিখিলের অস্ট্রেলিয়া যাত্রাটাও ছিল নাটকীয়। ২০২০ সালে জন্মদিন উপলক্ষে কুইন্সল্যান্ডে থাকা চাচার সঙ্গে দেখা করতে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ঠিক তখনই শুরু হয় কোভিড-১৯ মহামারি। সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে ফেরা সম্ভব হয়নি। সেই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিই পরে তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
প্রায় নয় মাস অস্ট্রেলিয়ায় আটকে থাকার পর তিনি ব্রিসবেনে ক্লাব ক্রিকেট খেলা শুরু করেন। সেখানে তার পারফরম্যান্স নজর কাড়ে স্থানীয় কোচদের। বিশেষ করে সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার জেমস হোপস তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বিগ ব্যাশের কয়েকটি ফ্র্যাঞ্চাইজির কাছে তার নাম সুপারিশ করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে হোবার্ট হারিকেন্সের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন নিখিল। এরপর ধীরে ধীরে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট কাঠামোর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়েন। তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। ক্রিকেটের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে জীবিকার জন্য নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে তাকে। কখনও রেস্তোরাঁয় সবজি কেটেছেন, কখনও ট্যাক্সি চালিয়েছেন, আবার কখনও পার্সেল ডেলিভারির কাজ করেছেন। নিখিল মনে করেন, এসব অভিজ্ঞতাই তাকে আরও শক্ত মানসিকতার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে।
তিনি বলেন, 'জীবনের কঠিন সময়গুলো আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। ক্রিকেটের বাইরে আরও কঠিন পরিস্থিতি দেখেছি বলেই মাঠে খুব বেশি চাপ অনুভব করি না। যেটা ভালোবাসি, সেটাই যখন করছি, তখন উদ্বেগও অনেক কম থাকে।'
অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতেও কোনো সমস্যা হয়নি বলে জানান তিনি। বরং দেশটির মানুষের সরলতা ও খোলামেলা আচরণ তার কাছে বেশ ভালো লেগেছে।
নিখিল বলেন, 'অস্ট্রেলিয়ান সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে খুব সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছি। এখানকার মানুষ খুব সরাসরি কথা বলে এবং বাস্তববাদী। এটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।'
জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার খবরটিকেও জীবনের সেরা মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। নির্বাচকদের ফোন পাওয়ার সময় তিনি বেলজিয়ামে ছিলেন। প্রথমে স্কোয়াডে ডাক পেলেও একাদশে সুযোগ পাবেন কি না, তা নিশ্চিত ছিলেন না। ম্যাচের আগের রাতে দলে থাকার খবর পেয়ে খানিকটা নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন।
অস্ট্রেলিয়া দলে এখন অভিজ্ঞ লেগস্পিনার অ্যাডাম জাম্পার কাছ থেকে শেখার সুযোগটাও কাজে লাগাতে চান নিখিল। তার মতে, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ১৫০ উইকেট নেওয়া কোনো সাধারণ অর্জন নয়।
তিনি বলেন, 'আমি জাম্পাকে অনেক প্রশ্ন করি। ক্যারিয়ারের শুরুতে সিনিয়রদের কাছ থেকে শেখাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সফল স্পিনার। যতটা সম্ভব তার কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করছি।'