উইজডেনের চোখে ভারতের প্রভাব 'অস্বাস্থ্যকর ও স্বৈরতান্ত্রিক'

উইজডেনের প্রতিবেদন
আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহর সঙ্গে ভারতীয় দল
আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহর সঙ্গে ভারতীয় দল
ক্রিকফ্রেঞ্জি ডেস্ক
ক্রিকফ্রেঞ্জি ডেস্ক
ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলে (আইসিসি) ভারতের প্রভাব কারো অজানা নয়। বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রাচীন ম্যাগাজিন উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালম্যানাক। নিজেদের ১৬৩ তম বার্ষিক সংস্করণে বিশ্ব ক্রিকেটে গত প্রায় দুই দশক ধরে ভারতের আধিপত্য বিস্তারকে 'অস্বাস্থ্যকর ও স্বৈরতান্ত্রিক' বলে দাবী করেছে তারা।

‎১৮৬৪ সাল থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হওয়া উইজডেনকে ক্রিকেটের 'বাইবেল' নামে অভিহিত করা হয়। ২০২৬ এর বার্ষিক সংস্করণে উইজডেনের সম্পাদক লরেন্স বুথ বিশ্ব ক্রিকেটের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভারতের এই অতি-নিয়ন্ত্রণের মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। ক্রিকেটকে ভারতের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রমাণ হিসেবে উইজডেন উল্লেখ করেছে আইপিএল থেকে বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে সরিয়ে দেবার ঘটনাকেও।

‎আইসিসির শীর্ষ পদের সবগুলোই এখন ভারতীয়দের নিয়ন্ত্রণে। প্রধান নির্বাহী সংযোগ গুপ্ত ও চেয়ারম্যান জয় শাহ উভয়েই রাজনৈতিক বিবেচনায় পদ পেয়েছেন বলে মনে করে উইজডেন। এ ছাড়াও বোর্ড ফর ক্রিকেট কন্ট্রোল ইন ইন্ডিয়াতে (বিসিসিআই) ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রভাবকে কটাক্ষ করে প্রতিবেদনে লেখা হয়, 'বিসিসিআই এখন বিজেপির ক্রীড়া শাখায় পরিণত হয়েছে।'

‎২০২৫ এশিয়া কাপকে ক্রিকেটকে রাজনীতিকরণের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন উইজডেনের সম্পাদক বুথ। এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের পর ভারতের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবের ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি জয় উৎসর্গ করাকে সমালোচনা করা হয় এই প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, 'ক্রিকেট এখন প্রাণঘাতী কার্যকলাপকে বৈধতা দেবার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই ধারণাটি আরও জোরালো করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, যখন তার দেশ ফাইনালে পাকিস্তানকে হারানোর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লেখেন, 'খেলার মাঠে অপারেশন সিন্দুর। ফল একই—ভারতের জয়! বাস্তব জীবনের ‘অপারেশন সিন্দুর’-এ দুই সীমান্তেই ডজনখানেক মানুষ নিহত হয়েছিল। এখন সেটিকেই একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে!

‎প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে আইপিএল থেকে উগ্রবাদীদের হুমকির মুখে মুস্তাফিজকে বাদ দেবার বিষয়টি।প্রতিবেদনে বুথ লিখেন, 'এটি ছিল মূলত বাংলাদেশের একজন হিন্দু ধর্মালম্বী হত্যার ঘটনার প্রতিশোধ নেয়া এবং কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিক শাহরুখ খানের প্রতি একটি সতর্ক বার্তা। যিনি নিজেও একজন মুসলিম এবং প্রায়ই হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।মুস্তাফিজুর রহমানের এই পরিণতি নিশ্চিত করেছে যে, ক্রিকেট এখন তার রাজনৈতিক নেতাদের কব্জায়।'

এ ছাড়াও মুস্তাফিজের এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেবার আবেদন নাকচ হয়ে যাবারও সমালোচনা করা হয় এই প্রতিবেদনে, '২০২৫ সালে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে, যখন ভারত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির জন্য পাকিস্তান সফর করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং জোর দিয়ে বলে যে তারা তাদের সব ম্যাচ দুবাইতে খেলবে, তখন আইসিসি তাদের সুবিধা দিতে প্রায় সবকিছুই মানিয়ে নেয়।'

'কিন্তু বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়—যদিও তারা সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ স্থানান্তরের অনুরোধ করেছিল। ভারত এই তুলনাকে অস্বীকার করে, যুক্তি দেয় যে বিসিসিআই আইসিসিকে বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের তুলনায় অনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছিল—যেন এটা খুবই প্রশংসার বিষয়।'

প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতীয় ক্রিকেটের কোনো প্রভাবশালী ক্রিকেটার কিংবা সংগঠককেই ভারতের এই স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবের সমালোচনা করতে দেখা যায়নি কখনোই। উইজডেনের দাবি, ভারত এমন ভান করে যেন তাদের এই বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কোনো নেতিবাচক প্রভাব নেই। উল্টো পরিস্থিতির শিকার হয়ে যারাই বাংলাদেশের মত প্রতিবাদ জানাচ্ছে, তাদেরকেই দোষারোপ করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরো যোগ করা হয়, 'খেলাধুলার শাসনব্যবস্থা ক্রমেই আরও "অরওয়েলীয়" (স্বৈরাচারী ও নিয়ন্ত্রণমূলক) হয়ে উঠছে।'

আরো পড়ুন: