বাংলাদেশকে এখন আর হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই: হোয়াটমোর

বাংলাদেশ ক্রিকেট
ক্রিকফ্রেঞ্জি
ক্রিকফ্রেঞ্জি
আবিদ মোহাম্মদ
আবিদ মোহাম্মদ
২০০৩ বিশ্বকাপে ভরাডুবি হওয়ার পরই বাংলাদেশের প্রধান কোচের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ডেভ হোয়াটমোর। শ্রীলঙ্কান এই কোচের অধীনেই একটু একটু করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু হয়েছিল তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিমদের। মাশরাফি বিন মুর্তজাও ছিলেন হোয়াটমোরের বাংলাদেশ দলের অন্যতম একজন। লাল-সবুজের বাংলাদেশের সঙ্গে চার বছর কাটিয়ে মিরপুর ছেড়েছিলেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে না এলেও পরবর্তীতে দুই দফায় বাংলাদেশে এসেছিলেন হোয়াটমোর।

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) কাজ করেছেন বরিশাল বুলস ও ফরচুন বরিশালের হয়ে। কয়েক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে এলেন হোয়াটমোর। এবার প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ হাই পারফরম্যান্স দল, এসেছেন মালয়েশিয়ার প্রধান কোচ হিসেবে। হোয়াটমোর আবার যখন ঢাকায় এলেন তখন বাংলাদেশ জাতীয় দল দুই টেস্টের সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া সফর করছে। মিরপুরে অনুশীলনের ফাঁকেই ক্রিকফ্রেঞ্জির প্রতিনিধি আবিদ মোহাম্মদ-এর সঙ্গে বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া, পেস বোলিং, ক্রিকেটের উত্থান নিয়ে নিজের ভাবনার কথা জানালেন হোয়াটমোর।

ক্রিকফ্রেঞ্জি: ডেভ আপনি তো বাংলাদেশে বহুবার এসেছেন। আবারও এলেন। বাংলাদেশে ফিরে কেমন লাগছে?

ডেভ হোয়াটমোর— বেশ ভালো লাগছে। জাতীয় দলের হয়ে চার বছর এবং বিপিএলে বরিশালের হয়ে দুই মৌসুম কাজ করেছিলাম। সবমিলিয়ে বাংলাদেশে আমার দারুণ কিছু স্মৃতি আছে। এখানে ফিরতে আমার সবসময়ই ভালো লাগে। এবারও ব্যতিক্রম নয়।

ক্রিকফ্রেঞ্জি: আপনি কোচ থাকাকালীন প্রথমবার বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়া সফর করে। দুই যুগ পর আবারও বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে গেছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের পুরো জার্নিটাকে আপনার ভাবনা কী?

ডেভ হোয়াটমোর— বাংলাদেশ অবশ্যই এখন ভালো ক্রিকেট খেলছে। দল হিসেবে খুব ভালো করছে। ২০০৩ সালের অস্ট্রেলিয়া সফরের কথা আমার এখনো মনে আছে। ওই সফরটা আমাদের জন্য আগুনের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো কঠিন একটা পরীক্ষা ছিল। তবে আমাদের জন্য দারুণ অভিজ্ঞতা ছিল। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের ঠিক আগে আমরা অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছিলাম।

আমাদের প্রথম টেস্ট সিরিজ। পুরো সফরটা আমরা বেশ উপভোগ করেছিলাম। প্রতিপক্ষ কতটা শক্তিশালী ছিল সেটা চোখের সামনে দেখার সুযোগ হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়াতে ভালো করতে না পারলেও ওই অভিজ্ঞতা আমাদের পাকিস্তান সফরে কাজে দিয়েছিল। বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন নিশ্চিতভাবেই অনেকটা এগিয়ে গেছে।

সত্যি বলতে বিশ্বমানের কিছু ক্রিকেটার উঠে এসেছে। বিশেষ করে মুশফিকুর রহিমের কথা বলব। বছরের পর বছর সে যেভাবে টিকে আছে এবং পারফর্ম করছে, তা সত্যিই অসাধারণ। দেখুন, সে এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হয় টেস্ট ক্রিকেটে সে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে যাচ্ছে। দারুণ ব্যাপার।

ক্রিকফ্রেঞ্জি: তখন তো আপনিই কোচ ছিলেন। এখন যখন বাংলাদেশ আবার অস্ট্রেলিয়া সফর করছে তখন আপনি বাংলাদেশে। এটাকে কী সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা বলবেন?

ডেভ হোয়াটমোর— আমি ঠিক জানি না (হাসি)। আমি এখন আর অস্ট্রেলিয়াতে থাকি না। আমার পরিবার এখন শ্রীলঙ্কায় থাকে। তবে হ্যাঁ, অস্ট্রেলিয়াতে আমার জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে। যেকোনো দলের হয়েই সেখানে সফর করা দারুণ ব্যাপার। বেশ আনন্দের। সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা নিয়ে কিছু বলতে পারব না।

তবে মালয়েশিয়া দলকে নিয়ে এখন বাংলাদেশে আসতে পেরে আমি খুবই খুশি। সামনে আমাদের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট আছে। আমরা আমাদের সেরা প্রস্তুতিটা নিতে চাই। তবে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড যেভাবে আমাদের সহযোগিতা করছে সেটা সত্যিই প্রশংসনীয়।

ক্রিকফ্রেঞ্জি: আপনি যখন কোচ ছিলেন তখন আপনার দলে মাশরাফি, সৈয়দ রাসেল,তাপস বৈষ্যর মতো হাতেগোনা কয়েকজন পেসার ছিলেন। এখন তো বাংলাদেশে অনেক পেসার। পেস বোলিংয়ের উন্নতিটা কিভাবে দেখেন। পাশাপাশি নাহিদ রানাকে নিয়ে আপনার মতামত কী?

ডেভ হোয়াটমোর— সত্যি বলতে নাহিদ রানা দারুণ একজন পেসার। সে খুবই গতিময় একজন। ওকে নিয়ে এখন সবাই প্রশংসা করছে। তবে পেস বোলিংয়ের উন্নতিটা শুধু বাংলাদেশের একা হয়েছে তেমন নয়। গোটা উপমহাদেশ কিংবা এই অঞ্চলের দিকে তাকালে দেখা যাবে দারুণ সব পেস বোলার উঠে এসেছে। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা— সবারই এখন ভালো মানের পেস বোলিং বিভাগ রয়েছে। পাকিস্তানের তো আগে থেকেই দারুণ সব গতিময় পেস বোলার ছিল।

এখন আফগানিস্তানেও বেশ কয়েকজন ভালো মানের পেসার তৈরি হচ্ছে। যদি তাদের পেস বিভাগের চেয়ে এখনো স্পিন বিভাগটা বেশি বিপদজনক। বাংলাদেশ অবশ্যই খুব ভালো করছে। তবে মূল বিষয়টা হচ্ছে এই অঞ্চলের সব দলই পেস বোলিংয়ের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে। তরুণ পেসারদের উৎসাহিত করতে ভালো উইকেট তৈরি করা হচ্ছে। বিদেশের মাটিতে গেলে আপনাকে এমন কন্ডিশনেই খেলতে হয়। ঘরের মাঠে সেটার প্রস্তুতি নেওয়াটাই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ।

ক্রিকফ্রেঞ্জি: বাংলাদেশ দলে এখন যারা খেলছে তাদের সম্পর্কে কতটা ধারণা আছে?

ডেভ হোয়াটমোর— দেখুন, কয়েকজনের নাম জানি। বিপিএলে কাজ করার সুবাদে দু-একজনকে দেখেছি। যদিও খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়নি। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলতে পারি বাংলাদেশ দলকে এখন আর হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

ক্রিকফ্রেঞ্জি: মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজেলউডদের সামলাতে বাংলাদেশের ব্যাটারদের কী পরামর্শ দেবেন?

ডেভ হোয়াটমোর— অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ম্যাচ জেতা কখনোই সহজ নয়। হ্যাজেলউড, স্টার্ক, কামিন্স মিলে দারুণ ওদের পেসত্রয়ীটা দারুণ। শুনলাম ওদের একজন পেসার (মাইকেল নেসার) চোট পড়েছে। কিন্তু ওদের স্কট বোল্যান্ডের মতো বোলারও আছে। যেকোনো সময়ই একই ধরনের ভয়ঙ্কর হতে পারে। ওদের বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে আপনি শ্বাস নেওয়ার সময় পাবেন না। আমার মনে হয় প্রথম ম্যাচটা বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। প্রথম টেস্টে লড়াই করে টিকতে পারলে দ্বিতীয় টেস্টের আগে দল বাড়তি একটা আত্মবিশ্বাস পাবে।

ক্রিকফ্রেঞ্জি: দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ভালো করতে বাংলাদেশকে কী করতে হবে?

ডেভ হোয়াটমোর— আমার মনে হয় মানসিকভাবে আপনাকে ইতিবাচক থাকতে হবে এবং আক্রমণাত্বক হতে হবে। প্রতিপক্ষ আপনাকে যেভাবে আক্রমণ করবে আপনাকেও একই লেভেলে গিয়ে পাল্টা লড়াই করতে হবে। সামর্থ্য কিংবা দক্ষতার কথা বললে তারা ঠিকই আছে। তবে মূল পার্থক্যটা গড়ে দিতে পারে কন্ডিশন। অস্ট্রেলিয়া পুরোপুরি ভিন্ন একটা কন্ডিশন। দল হিসেবে শক্তি হয়ত কাছাকাছি কিন্তু কন্ডিশন একেবারেই আলাদা। অনুশীলনের জন্য যতটা বেশি সময় পাওয়া যাবে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ততটা সহজ হবে। যতদূর জানি আজকে একটা প্রস্তুতি ম্যাচও খেলেছে।

ক্রিকফ্রেঞ্জি: মালয়েশিয়া দলকে নিয়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। এইচপি দলের বিপক্ষে কোনো অঘটন ঘটাতে পারবেন বলে মনে হয়?

ডেভ হোয়াটমোর— বাংলাদেশের এইচপি দল নিয়ে আমার খুব বেশি ধারণা নেই। তবে তারা নিশ্চিতভাবেই শক্তিশালী। আসল কথা হচ্ছে আমরা এখানে মানসম্মত দলের বিপক্ষে খেলতে এসেছি। তারা যদি আমাদের বড় ব্যবধানে হারিয়ে দেয় সেটাও আমাদের জন্য শেখার বড় একটা সুযোগ। আবার আমরা যদি ভালো করতে পারি সেটাও বড় একটা প্রাপ্তি। বলতে গেলে আমরা উইন-উইন পরিস্থিতিতে আছি।