তামিম ইকবাল এলেন দুপুর তিনটার একটু পর। বিসিবি সভাপতির একটু পর এলেন নাঈম হাসান, ইবাদত, তাসকিন আহমেদের মতো ক্রিকেটাররা। মঞ্চ উঠেই প্রতিভা খুঁজে বের করার জন্য রবির প্রয়াস ও দেশের ক্রিকেটে তাদের অবদান নিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন তামিম। একটা সময় বাংলাদেশ দলে শুধু একজন পেসার খেলানো হতো। সেই পেসারও খুব বেশি বল করার সুযোগ পেতেন না। এমন কঠিন সময়েও দেশের ক্রিকেটের কথা বিবেচনায় রবির পেসার হান্ট কতটা সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল সেটাই তুলে ধরেছেন বিসিবি সভাপতি।
এ প্রসঙ্গে তামিম বলেন, ‘যখন এই প্রোগ্রামটা শুরু হয় তখন হয়তবা জাতীয় দলে আমিও খেলতাম। এমনও অনেক সময় গেছে যখন আমরা একজন পেস বোলার খেলানোর জন্য খেলিয়েছি। হয়তবা ওই ম্যাচে পেস বোলার দুই-তিন ওভার বল করতো, তারপর সবসময় স্পিনাররা বল করতো। ওই সময় পেস বোলিং হান্ট করে রবি বড় একটা বার্তা দিয়েছিল। রবি স্রোতের সাথে যায়নি বরং রবি স্রোতের বিপরীতে গিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এজন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট ও বাংলাদেশের পেস বোলিং বদলে দেওয়ার পেছনে রবির অবদান অনেক। রবিকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অংশ মনে করি, শুধু স্পন্সর হিসেবে দেখি না।’
২০১৭ সালে রবির স্পিনার হান্ট থেকে উঠে এসেছিলেন রিশাদ। ডানহাতি লেগ স্পিনার সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলে খেলার পাশাপাশি বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগেও দাপটের সঙ্গে পারফর্ম করছেন। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালের পেসার হান্ট থেকে উঠে এসেছিলেন ইবাদত। ডানহাতি পেসার ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডের মাউন্টমঙ্গানুই টেস্ট জেতাতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। পেসার ও স্পিনারদের জন্য আলাদা করে পেসার হান্ট করা হলেও এবার করা হচ্ছে বোলারদের জন্য।
যার ফলে একই সাথে প্রতিভাবান পেসার ও স্পিনার খুঁজে বের করতে পারবে তারা। তামিম বলেন, ‘আমি খুশি রবির নিজেদের অনেক আগ্রহ ছিল প্রোগ্রামটা করার জন্য। পাশাপাশি আমরাও চাচ্ছিলাম প্রোগ্রামটা করি। যখন আমরা এটা নিয়ে বসি তখন আমরা চেয়েছি এটার নাম বোলার হান্ট দিই। শুধু পেসারদের ফোকাস না করে স্পিনার, মিস্ট্রি স্পিনার যে কেউই অংশ নিতে পারে।’
বিভিন্ন সময়ে ছেলেদের হান্ট হলেও এখনো পর্যন্ত মেয়েদের জন্য তেমন কিছু করতে পারেনি বিসিবি ও রবি। তবে তাদের দুই পক্ষের প্রচেষ্টায় এবারই প্রথম ছেলে ও মেয়েদের বোলার হান্ট আয়োজন করা হচ্ছে। সিলেট থেকে শুরু হওয়ার পর বরিশাল, খুলনা, ময়মনসিংহের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি বিভাগে হবে ট্রায়াল। মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ যেন উদ্বিগ্ন না থাকেন সেটার জন্য সবাইকে আশ্বস্ত করেছেন তামিম।
বিসিবি সভাপতি বলেন, ‘দুই পক্ষ থেকেই আমরা চেয়েছি মেয়েদের জন্যও একটা বোলার করব, একসাথেই করব। আপনাদের মাধ্যমে বার্তাটা সবাইকে দিতে চাই যখন ছেলেদের বোলার হান্ট হবে তাদের জন্য একটা কোচিং প্যানেল থাকবে। ঠিক তেমনি আলাদাভাবে মেয়েদের জন্যও কিন্তু থাকবে। আপনাদের মাধ্যমে সবাইকে অনুরোধ করতে চাই— যারা বাবা-মা, ভাই-বোন যারা আছেন তারা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হইয়েন না।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আপনাদের বাসার মেয়েদের, বাচ্চাদের অবশ্যই পাঠাবেন। ওদের যদি ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ থাকে তারা আসবে, খেলবে। তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। বিসিবির তরফ থেকে আমরা আছি, রবিও আছে। আমরা তাদের দেখভাল করব। আপনাদের যদি বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন থাকে, এমনকি ক্রিকেট খেলতে চান আপনাদের জন্য বড় সুযোগ।’
প্রতিভা খুঁজে বের করতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের স্পিন বোলিং কোচ মুশতাক আহমেদ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক পেসার কোরি কলিমোর দায়িত্বে থাকবেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক কয়েকজন ক্রিকেটারও বিচারক হিসেবেও থাকবেন। বিভিন্ন সময়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটার ও সুপারস্টাররাও ট্রায়ালে উপস্থিত থাকবেন।
তামিম বলেন, ‘আশা করি আপনারা সবাই অংশ নেবেন। আপনাদের যে প্রতিভা আছে সেটা আপনারা দেখাবেন। একটা প্রোগ্রাম হচ্ছে আমরা বিসিবির তরফ থেকে দুইটা কোচ দিয়ে দিব তা না। আমাদের সেরা কোচরাই সেখানে থাকবেন এবং দেখভাল করবেন। পাশাপাশি আমাদের জাতীয় দলের যারা ক্রিকেটার, সুপারস্টার আছেন তারাও বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্পে যাবেন। আধা ঘণ্টা কিংবা এক ঘণ্টার জন্য হলেও ওরা ওইখানে যাবে।’
বিসিবি সভাপতির বিশ্বাস, বোলার হান্টের মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে এমন অন্তত ৪-৫ জনকে খুঁজে পাওয়া যাবে। তামিম বলেন, ‘আমি খুবই আশাবাদী এই ক্যাম্পেইন থেকে আমরা হয়তবা আরও ৪-৫ জন বোলার পাব যারা বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করব বা বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্য লেভেলে অংশগ্রহণ করবে।’
২০০৫ সাল থেকেই প্রতিভা অন্বেষণ হয়ে আসছে। রবির সৌজন্যে সবশেষ পেসার ও স্পিনার হান্ট হয়েছে ৮ বছর আগে। তামিম মনে করেন, এত লম্বা সময় ধরে এমন প্রতিভা খুঁজে বের করার প্রোগ্রাম না হওয়া বিসিবির ব্যর্থতা। এতটা লম্বা সময় গ্যাপ দেওয়া উচিত হয়নি বলে জানান বিসিবি সভাপতি।
তামিম বলেন, ‘আমি রবির অফিসে গিয়েছিলাম, আমি গিয়ে উনাদের সাথে বিভিন্ন টপিকে অনেক কথা বলেছি। গত ৭-৮ বছর ধরে প্রোগ্রামটা হয় না। এটা বিসিবির ব্যর্থতা। আমার কাছে মনে হয় লাস্ট দু’বার যখন এটা হয়েছিল তখন আমরা রিশাদ ও ইবাদতের মতো দুজন সুপারস্টার পেয়েছিলাম।’
‘আমরা রিশাদ ও ইবাদতের কথা বলি কারণ তারা বাংলাদেশ জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু এমন আরও অনেকে আছে যারা এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে তাদের জীবন, পরিবার চালাচ্ছে এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটকে সার্ভ করতেছে। সুতরাং এই ৭-৮ বছরের গ্যাপ বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ঠিক হয় নাই। এটা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ব্যর্থতা।