তানজিম-মুস্তাফিজের বোলিংয়ে ইতিহাস গড়ে সুপার এইটে বাংলাদেশ

ছবি:

|| ডেস্ক রিপোর্ট ||
পিচ রিপোর্টের সময় স্যামুয়েল বদ্রি জানালেন, স্পিনাররা এখানে নিজেদের উপভোগ করবে। ব্যাটসম্যানদের জন্য কাজটা হবে চ্যালেঞ্জিং। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিশ্বকাপজয়ী সাবেক স্পিনারের কথাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়েছে। পেস বোলিংয়ে বাউন্সের সঙ্গে স্পিনাররা পেয়েছেন বাড়তি টার্ন। নেপালের বোলারদের সামনে দাঁড়াতে পারেননি বাংলাদেশের ব্যাটাররা। আরও একবার ব্যাটারদের ব্যর্থতায় বাংলাদেশকে থামতে হয়েছে মাত্র ১০৬ রান। স্বল্প পুঁজি নিয়ে টাইগারদের স্বপ্নের মতো শুরু এনে দেন তানজিম হাসান সাকিব।
আগুনে বোলিংয়ে নেপালের ব্যাটিং ইউনিটে ধস নামিয়েছেন তরুণ এই পেসার। ৪ ওভারে ২ মেইডেন নেয়া তানজিম ৭ রান খরচায় নিয়েছেন ৪ উইকেট। আরেক পেসার মুস্তাফিজুর রহমান ৩ উইকেট নিতে খরচা করেছেন ৭ রান। সাকিব আল হাসানও সঙ্গে দিয়েছেন দারুণভাবে। ২.২ ওভারে ৯ রান দেয়া বাঁহাতি স্পিনারের শিকার ২ উইকেট। তাদের তিন জনের বোলিংয়ে মাত্র ৮৫ রানে গুটিয়ে যায় নেপাল।
ফলে ২১ রানের জয়ে সুপার এইটে খেলা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। সুপার এইটে যাওয়ার সঙ্গে রেকর্ডও গড়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। এবারই প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কোন আসরে তিনটি জয়ের দেখা পেয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে সবশেষ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ দুটি ম্যাচ জিতেছিল তারা। সুপার এইটে টাইগারদের প্রতিপক্ষ ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং আফগানিস্তান।
সেন্ট ভিনসেন্টে ১০৬ রান তাড়ায় তানজিম হাসান সাকিবের প্রথম বলে চার মেরে রানের খাতা খোলেন কুশাল ভ্রুর্টেল। পরের ওভারে তাসকিন আহমেদকে চার মেরেছেন আসিফ শেখ। তবে ইনিংসের তৃতীয় ওভারে উইকেট হারায় নেপাল। তানজিমের ফুলটস বলে জায়গা বানিয়ে খেলার চেষ্টা করেছিলেন ভ্রুর্টেল। ডানহাতি এই পেসারের শেষ মুহূর্তের সুইংয়ে বলের লাইন মিস করে বোল্ড হয়েছেন তিনি। এক বল পর লেংথ ডেলিভারিতে উড়িয়ে মারতে চাওয়ার প্রচেষ্টায় নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে ক্যাচ দিয়েছেন অনিল শাহ।
তিন বলের ব্যবধানে ২ উইকেট নেয়া তানজিম নিয়েছেন মেইডেন ওভার। নিজের পরের ওভারে এসে আরও একটি উইকেট নিয়েছেন তানজিম। তরুণ এই পেসারের লেংথ ডেলিভারিতে কাট করতে গিয়ে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে থাকা রিশাদ হোসেনের হাতে ক্যাচ দিয়েছেন রোহিত পাউডেল। বোলিংয়ে এসে উইকেটের দেখা পেয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমানও। বাংলাদেশের এই পেসারের ফুলার লেংথ ডেলিভারিতে ড্রাইভ করতে গিয়ে সাকিব আল হাসানের দারুণ ক্যাচে ফিরেছেন ১৭ রান করা এই ব্যাটার।
নেপালকে গুঁড়িয়ে দেয়া তানজিমকে টানা ৪ ওভার বোলিং করিয়েছেন নাজমুল শান্ত। নিজের শেষ ওভারের শেষ বলে কাট করতে গিয়ে রিশাদের হাতে ক্যাচ দিয়েছেন সন্দীপ ঝরা। নেপালের ৫ উইকেটের চারটিই নিয়েছেন তানজিম সাকিব। ৪ ওভারের বোলিংয়ে দুই মেইডেন নেয়া এই পেসার খরচ করেছেন ৭ রান। বাংলাদেশের প্রথম বোলার হিসেবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এক ইনিংসে দুই মেইডেন নিয়েছেন তানজিম।

২৬ রানে ৫ উইকেট হারানোর পর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন দীপেন্দ্র সিং আইরি এবং কুশাল মাল্লা। তারা দুজনে মিলে যোগ করেছেন ৫২ রান। তাদের দুজনের জমে ওঠা জুটি ভাঙেন মুস্তাফিজ। বাঁহাতি পেসারের স্লোয়ার ডেলিভারিতে উড়িয়ে মারতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন তিনি। খানিকটা দৌড়ে গিয়ে দারুণ এক ক্যাচ লুফে নেন শান্ত। ফলে কুশালকে ফিরতে হয় ২৭ রানে। দ্রুতই ফিরে গেছেন গুলশান ঝা। আরেক ব্যাটার দীপেন্দ্র আউট হয়েছেন ২৫ রানে। ইনিংসের শেষ ওভারের প্রথম দুই বলে দুই উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেন সাকিব।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের এবারের আসরে বেশ কয়েকবারই ওপেনিং জুটিতে পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ। নেপালের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচেও এসেছে পরিবর্তন। সবশেষ দুই ম্যাচে তানজিদ হাসান তামিমের সঙ্গে নাজমুল হোসেন শান্ত এলেও এদিন এসেছিলেন লিটন দাস। তবে তাদের দুজনের ওপেনিং জুটি এক বলের বেশি টেকেনি। ইনিংসের প্রথম বলেই ফিরে যান তানজিদ হাসান। সোমপাল কামির প্রথম বলেই ডাউন দ্য উইকেটে এসে খেলতে গিয়ে লিডিং এজ হয়ে বোলারের হাতে ক্যাচ দিয়েছেন।
সোমপাল ক্যাচ লুফে নিতেই গোল্ডেন ডাক মেরে ফিরে যেতে হয় বাঁহাতি এই ওপেনারকে। একই ওভারে রিভিউ নিয়ে বেঁচে গেছেন লিটন। ডানহাতি এই পেসারের ফুলার লেংথ ডেলিভারিতে আম্পায়ার লেগ বিফোর উইকেট দিলেও রিভিউ নেন তিনি। টিভি রিপ্লেতে দেখা যায় বল লেগ স্টাম্পের বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যেতো। যার ফলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয় অনফিল্ড আম্পায়ারকে। লিটন বেঁচে যাওয়ার পরের ওভারে আউট হয়েছেন শান্ত।
দীপেন্দ্র সিং আইরির অফ স্টাম্পের বাইরে ফুলার লেংথে ভেতরে ঢোকা ডেলিভারিতে ডিফেন্স করতে গিয়ে বলেন লাইন মিস করেন বাংলাদেশের অধিনায়ক। ব্যর্থতার বৃত্তে আটকে থাকা শান্তকে ফিরতে হয় ৪ রানে। প্রথম ওভারে রিভিউ নিয়ে বেঁচে গেলেও বড় ইনিংস খেলতে ব্যর্থ হয়েছেন লিটন। সোমপালের লেংথ ডেলিভারিতে পুল করতে গিয়ে টপ এজ হয়ে উইকেটকিপার আসিফ শেখের গ্লাভসে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন ১০ রান করা এই ব্যাটার।
পাওয়ার-প্লে শেষ হওয়ার আগে সাজঘরে ফিরেছেন তাওহীদ হৃদয়ও। রোহিত পাউডেলের ফুলার লেংথের স্লোয়ার ডেলিভারিতে স্লগ সুইপ করে ছক্কা মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন সন্দীপ লামিচানের হাতে ক্যাচ দিয়ে। তরুণ এই ব্যাটারের হাত থেকে এসেছে ৯ রান। ৩০ রানে ৪ উইকেট হারানোর পর প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও সাকিব। তবে নিজেদের ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউট হয়েছেন মাহমুদউল্লাহ। লামিচানের ফুলটস ডেলিভারিতে এক্সট্রা কভারে ঠেলে দিয়ে এক রান নিতে চেয়েছিলেন সাকিব।
মাহমুদউল্লাহ সাড়া দিলেও শেষ মুহূর্তে গুলশান ঝার হাতে বল দেখে থেমে যান বাঁহাতি এই ব্যাটার। তবে নন স্ট্রাইক প্রান্তে থাকা মাহমুদউল্লাহ অনেকটা বেরিয়ে গিয়েছিলেন। যার ফলে ফিরে আসার আগেই উইকেট ভেঙে দেন লামিচানে। রান আউট হয়ে ফিরে যেতে হয় ১৩ রান করা এই ব্যাটারকে। একপ্রান্ত আগলে রেখে খেলছিলেন সাকিব। তিনিও থিতু হতে পারেননি। রোহিতের গুগলিতে বিভ্রান্ত হয়ে এলবিডব্লিউ হয়েছেন বাঁহাতি এই ব্যাটার। অবশ্য রিভিউ নিয়েছিলেন সাকিব। তবে কাজের কাজ হয়নি। বলের ইমপ্যাক্ট ও পিচিং ছিল ইন লাইন। বলও স্টাম্পে হিট করত। ফলে ২২ বলে ১৭ রান করে ফিরে যেতে হয় তাকে।
আগের বলেই সন্দ্বীপ লামিচানের বলে এলবিডব্লিউ হয়েছিলেন তানজিম হাসান সাকিব। যদিও রিভিউ নিয়ে বাঁচেন তিনি। রিভিউতে দেখা যায় বল অফ স্টাম্প ছাড়িয়ে যেত। পরের বলেই স্লগ সুইপ করতে গিয়ে ব্যাট ও প্যাডের ফাঁক গলে বোল্ড হয়েছেন ৩ রান করা তানজিম। এরপর জাকের আলী আউট হয়েছেন লামিচানের গুগলিতে বোল্ড হয়ে। ফলে ৭৫ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। আর তাতেই শততম টি-টোয়েন্টি উইকেটের স্বাদ পেয়ে যান এই লঙ্কান স্পিনার।
টানা ৪৪ বল বাংলাদেশ বাউন্ডারি শূন্য ছিল। রিশাদ হোসেল কুশল ভুর্তেলকে পুল করে স্লগ সুইপে ছক্কা মেরে সেই নিরবতা ভেঙেছেন। এরপর একটি চারে সেই ওভার থেকে আসে ১৩ রান। যা বাংলাদেশের ইনিংসে সর্বোচ্চ। শেষ বলে তাসকিন আহমেদকে আউটের রিভিউ নিয়েছিল নেপাল। তবে বল লেগ স্টাম্পের বাইরে পিচ করায় বেঁচে যান তাসকিন।
রিশাদ আগের ওভারের মতো আইরের ওপর চড়াও হতে চেয়েছিলেন। তবে পারলেন না। নেপালি এই স্পিনারের বলে লং অফে ধরা পড়ে ৭ বলে ১৩ রানে শেষ হয়েছে তার ইনিংস। শেষদিকে তাসকিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমানের ব্যাটে ভর করে একশ পাড় হয় বাংলাদেশের সংগ্রহ। ইনিংসের শেষ ওভারে মুস্তাফিজ ৩ রান করে রান আউট হলে বাংলাদেশের ইনিংস থামে ১০৬ রানে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ- ১০৬/১০ (১৯.৩ ওভার)(তানজিদ ০, শান্ত ৪, লিটন ১০, সাকিব ১৭, হৃদয় ৯, মাহমুদউল্লাহ ১৩, তাসকিন ১২*)
নেপাল- ৮৫/১০ (১৯.২ ওভার) (তানজিম ৪/৭)