মাশরাফি কি মালিঙ্গার মতো ভাগ্যবান হবেন?

ছবি: ছবিঃ বিসিবি, রতন গোমেজ

|| ক্রিকফ্রেঞ্জি করেসপন্ডেন্ট ||
কিংবদন্তি লাসিথ মালিঙ্গার বিদায় রাজকীয়ভাবেই দিয়েছে শ্রীলঙ্কা। 'গার্ড অব অনার' পার করে বোলিংয়ে যান মালিঙ্গা। ব্যাট হাতে মাঠে নামার সময় জাতীয় পতাকা হাতে তাঁর পেছনে ছিলেন একজন। বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ১৮ বছর ধরে সেবা দিয়ে যাওয়া মাশরাফি বিন মুর্তজা কি মালিঙ্গার মতো এতোটা ভাগ্যবান হবেন?
যেভাবে বিদায় বলতে চেয়েছেন মালিঙ্গা, তাঁর ইচ্ছার একটুও অপূর্ণ ছিল না; বলাই যায়। বরং মালিঙ্গার প্রত্যাশাকে অতিক্রম করেছে তাঁর বিদায় লগ্নের মুহূর্ত। ঘরের মাঠে সমর্থকদের সামনে নিজের শেষ ম্যাচ খেলতে চেয়েছিলেন মালিঙ্গা। সেই ইচ্ছাও পূরণ হয়েছে তাঁর।
বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচ খেলেই অবসরে যাবেন লঙ্কান এই কিংবদন্তি, এমনটা আগেই জানা ছিল। তাই এই ম্যাচের টিকিট একদিন আগেই বিক্রি হয়ে যায়। আর ম্যাচের দিন দর্শকে কানায় কানায় ভরপুর ছিল কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম।
মালিঙ্গার পোষ্টারে ভরে ছিল সম্পূর্ণ স্টেডিয়াম। সমর্থকরা নিশ্চিত করতে চেয়েছে তাদের মহানায়কের বিদায়ে যেন কোনো কমতি না থাকে। টিকিট বিক্রি শেষ ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের বাইরে ছিল দর্শকদের ভিড়, যারা ছিলেন শুধুই টিকিটের সন্ধানে।
পুরো পরিবেশ এটাই জানান দিচ্ছিল, শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট সমর্থকরা কতটা সম্মান এবং ভালবাসে তাদের আইডল মালিঙ্গাকে। এই কিংবদন্তির বিদায়কে রাজসিক করে রাখতে এক ফোঁটাও কমতি রাখেননি তারা।
মালিঙ্গার মতো এমন বিদায় চাইতে পারেন বাংলাদেশ দলের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফিও। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থক মহলের এই মুহূর্তে যে অবস্থা, তা স্বাভাবিকভাবেই মাশরাফির এমন রাজসিক বিদায়ের ইঙ্গিত দেয় না।

গত বছর রাজনীতিতে যোগ দেয়ার পর থেকেই শুরু হয় মাশরাফির অবসর নিয়ে আলোচনা। অনেককেই বলতে শোনা গেছে, রাজনীতির কারণে ক্রিকেটে আগের মতো মনোযোগী হতে পারবেন না মাশরাফি। তাঁর জন্য দুই জায়গায় ভারসাম্য ধরে রাখা হবে অসাধ্য।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ চলাকালে গুঞ্জন উঠেছিল ঘরের মাঠে এটাই মাশরাফির শেষ সিরিজ। আর সফরকারীদের বিপক্ষে সিলেটে খেলা ম্যাচটি হতে যাচ্ছে তাঁর শেষ ম্যাচ। সেসময় মাশরাফি বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফিরে অবসর নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
বিশ্বকাপ চলাকালে মাশরাফি জানান, এই টুর্নামেন্টের পরও খেলা চালিয়ে যেতে চান তিনি। মাশরাফির এমন ঘোষণার পর বিসিবির সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেছিলেন; ঘরের মাঠে মাশরাফিকে বিদায় দেয়ার জন্য ঘরের মাঠে বিদায়ী ম্যাচ আয়োজন করতে চায় বোর্ড।
শ্রীলঙ্কা সফর থেকে ছিটকে পড়ার পূর্বে মাশরাফি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, তাঁর অবসর মিডিয়ার জন্য হয়তো শুধুমাত্র সংবাদ হিসেবে গণ্য হয়, কিন্তু তাঁর জন্য এই সিদ্ধান্ত এর চেয়েও বড় কিছু। যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, এটাই তাঁর শেষ সফর কিনা? কিছুটা ভিন্ন সুরে উত্তর দিয়েছিলেন মাশরাফি, যেখানে তাঁর কণ্ঠে ভেসে এসেছিল আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি,
'সত্যি কথা বলতে বিষয়টি আপনারা কিভাবে নেবেন সেটা আপনাদের ওপর। আমি বলতে পারছি না, কারণ আমি সেভাবে ভাবছি না। এটা সত্যি যে এই সিরিজের পর আমাদের লম্বা সময় কোনো খেলা নেই। আপনাদের জন্য এটা (অবসর) শুধু নিউজ কিন্তু আমার কাছে এর থেকেও বেশি। কয়েক লাইন লিখলেই আপনাদের কাজ শেষ কিন্তু আমার জন্য অনেক ভাবনার বিষয়।' বলেছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।
মাত্র একটি উইকেট নিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শেষ করেন মাশরাফি। তাঁর এই পারফর্মেন্সই সমালোচনার আগুনে যেন ঘি ঢেলে দিয়েছিল। মাশরাফি নিজে এই ব্যাপারে অবগত আছেন। তিনি বলেছিলেন,
'এটা সত্যি বিশ্বকাপের পারফর্মেন্সের কারণে এই সমালোচনাগুলো আসছে। আমি বিশ্বকাপে বোলার হিসেবে ভালো পারফর্ম করতে পারিনি এমনকি দলকে নেতৃত্ব দিয়েও প্রত্যাশিত ফলাফল এনে দিতে পারিনি।' বলেছিলেন মাশরাফি, যিনি বিশ্বকাপে মাত্র একটি উইকেট পেয়েছিলেন এবং নেতৃত্ব দিয়ে দলকে সেমিফাইনালে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের পারফর্মেন্সে সন্তুষ্ট নয় বিসিবির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। বিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে শ্রীলঙ্কা সফর থেকে ছিটকে পড়েছেন মাশরাফি।
'গ্রেড ওয়ান টিয়ার' ধরা পড়ে মাশরাফির পায়ে। কিন্তু বিশ্বকাপে এর চেয়ে বড় ইনজুরি 'গ্রেড টু টিয়ার' নিয়ে খেলেছিলেন বাংলাদেশের এই অধিনায়ক। মাশরাফি লঙ্কান সফরে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু বিসিবি কর্তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁকে বিশ্রামে রাখার।
ড্রেসিং রুমের এক বিশ্বস্ত সূত্র বলেছে, 'তাঁর (মাশরাফি) মতে, তিনি দ্বিতীয় ম্যাচ থেকে খেলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন কিন্তু বিসিবি কর্তারা অন্য ভাবনায় আছে হয়তো।'
বিবেচনার বিষয়, লঙ্কান সিরিজের পর বাংলাদেশের কোনো ওয়ানডে ম্যাচ নেই। আফগানিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ রয়েছে বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এশিয়া একাদশ এবং বিশ্ব একাদশের একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ আয়োজন করবে ২০২০ সালের মার্চে, ঘোষণা দিয়েছে বিসিবি।
শুরুতে ভাবা হয়েছিল ম্যাচটি মাশরাফি বিদায়ী ম্যাচ হিসেবে আয়োজন করছে বিসিবি। কিন্তু টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে হতে যাচ্ছে ম্যাচটি। বিসিবি ফরম্যাট পরিবর্তন না করলে এই ম্যাচটিও খেলা হবে না মাশরাফির। কারণ ২০১৭ সালেই টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নিয়েছেন বাংলাদেশের সেরা অধিনায়ক।
যেখানে শ্রীলঙ্কা মালিঙ্গাকে সম্মানের সঙ্গে বিদায় দিতে কোনো ত্রুটি রাখেনি সেখানে মাশরাফি বিদায়ী ম্যাচ পাবেন কিনা সেটা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। রাজকীয় অবসর নাকি নিরব প্রস্থান হবে দেশের ক্রিকেটের অন্যতম সেরা এই অধিনায়কের সেটাই এখন দেখার বিষয়।