নীরবে-নিভৃতে তাইজুলের পথ চলা

ছবি: তাইজুল ইসলাম, ক্রিকফ্রেঞ্জি

|| ক্রিকফ্রেঞ্জি করেসপন্ডেন্ট ||
এক ফরম্যাটের বিশেষজ্ঞ ক্রিকেটার হয়ে টিকে থাকা খুব কঠিন, বাংলাদেশ ক্রিকেটের জগতে। 'সাদামাটা' টেস্ট ক্রিকেট ও এই ফরম্যাটের বিশেষজ্ঞ ক্রিকেটারদের পাদপ্রদীপের আলোয় রাখতে চাই না আমরা, সেই আলোর অভাবে অনেকেই হারিয়ে যায় অন্ধকারে।
ক্রিকেটাররাও মানতে চায় না, কেন আমিই এক ফরম্যাট খেলে যাব? এখানে তো তেমন সুনাম, অর্থকড়ি কিছুই পাচ্ছি না। চেষ্টা থাকে টেস্টের পারফর্মেন্স দিয়ে আরেক ফরম্যাটের টিকেট হাসিল করা। কেউই মনের গহীনে লালন করে না, এই সাদামাটা ক্রিকেটটাই আসল ক্রিকেট, সত্যিকারের 'গ্রেটনেস' অর্জনের পাথেয়।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের সংস্কৃতিটাই এমন, পথভ্রষ্ট যুবকের মতন। তাইজুল ইসলাম, তিনি পথভ্রষ্ট যুবক হন নি, তিনি সঠিক পথটা চিনেছেন, খুব দ্রুতই। টেস্ট ক্রিকেটটাই তাঁর ফরম্যাট, তিনি বিষয়টি বিশ্বাস করেছেন, মেনে নিয়েছেন।
টিভি ক্যামেরা বার বার তাঁর দিকে তাকায় না। ফটোগ্রাফাররাও আগ্রহ দেখায় না। অনেকে তো বলেই বসে, 'তাঁর ছবি ভালো আসে না।' সাংবাদিক মহলের আড্ডায় ওঠে না তাঁর নাম। তাঁকে সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে নিতে বাধ্য করতে হয়, মাঠের পারফর্মেন্স দিয়ে, তিনি তাইজুল ইসলাম।

কিন্তু তবুও নিরবে, নিভৃতে বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে অভিজাত ফরম্যাটের একমাত্র বিশেষজ্ঞ বনে গেছেন তিনি। বাংলাদেশ ক্রিকেটে টেস্ট বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান ও কর্মী তিনিই, আর কেউ নেই। সুনিল যোশি, বাংলাদেশ দলের স্পিন কোচ এই তাইজুলেই মুগ্ধ।
'আমি দলের সাথে আছি প্রায় দেড় বছর, আমি তাইজুলকে দেখেছি কঠোর পরিশ্রম করতে। যদিও সে মাত্র একটি ফরম্যাট খেলে থাকে। সে ঘরোয়া ক্রিকেটে অনেক ওভার বল করে এসেছে, তাঁর সাফল্য আমাকে খুশি করে। তাঁকে আমি যা দেয়ার চেষ্টা করছি, সে সেটাই গ্রহন করেছে। আমি তাঁকে যদি কোন ইস্যুতে কাজ করতে বলি, সে নিরলস ভাবে সেটা করে যাবে। তাইজুল আন্তরিক। তাঁর কঠোর পরিশ্রমের কারণেই হয়তো স্রষ্টা তাঁকে পুরস্কার দিচ্ছে।
'তাইজুল মানসিকতার পরিবর্তন মেনে নিয়েছে। কারণ সে শুধু টেস্ট ক্রিকেট খেলে। টেস্ট ক্রিকেট মানেই চরিত্র, স্কিল ও ধৈর্যের পরীক্ষা, যা তাইজুল মেনে নিয়ে নিজের খেলার এনেছে। আমরা এখন ফলাফলটা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। তাইজুলকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। এক ফরম্যাটে খেলে যাওয়া অনেক বেশি চেষ্টা সাধনার ব্যাপার। কারণ ভিন্ন ভিন্ন সিরিজে ভিন্ন বলে খেলা, দীর্ঘদিন পর খেলা, সব কিছুই তাইজুলের জন্য প্রযোজ্য, যা মিরাজ বা অন্যদের জন্য নয়। কারণ তাঁরা সবসময় খেলার মধ্যে আছে।'
আসল ফরম্যাট টেস্ট ক্রিকেট দাপিয়ে বেড়ানোই এখন তাইজুলের মূল কাজ। ২০১৪ সালে অভিষেক হওয়া তাইজুল টেস্ট ক্রিকেটে গত চার বছরে স্টার পারফর্মার সাকিব আল হাসান থেকেও বেশি টেস্ট উইকেট নিয়েছেন। ২১ টেস্ট, ৩৮ ইনিংসে ৮৭ উইকেট শিকার করেছেন তিনি। অন্য দিকে ২১ টেস্ট, ৩৬ ইনিংসে ৮৩ উইকেটের মালিক সাকিব।
ইতিমধ্যেই এক বছরে সবচেয়ে উইকেট শিকারির তালিকায় সাকিবকে ছাড়িয়ে গেছেন তাইজুল। অল্প দূরে থাকা মোহাম্মদ রফিককে দ্রুতই ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে তাঁর সামনে। সদ্য শেষ হওয়া জিম্বাবুয়ে সিরিজে চার ইনিংসে তিনবার পাঁচ উইকেট শিকার করেছেন।
সাকিব আল হাসানের শুন্যতা বুঝতে দেননি একবারও। বোলিং আক্রমনের নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন নিরলস ভাবে। দলের জন্য এক প্রান্ত আগলে রেখে বল করে গেছেন। টানা ২০ ওভারের স্পেলও করতে দেখা গেছে তাঁকে, স্পেলের প্রথম বল থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল সমান চেষ্টা, প্রতিজ্ঞার ছাপ।
কিন্তু দিন শেষে তাইজুল ছায়ার ঢাকা পড়েন, নিয়মিত। তিনি পারফর্ম করেন, ক্ষণিকের হাততালি আদায় করে নেন। তারপর ভিন্ন ফরম্যাটের দামামা বাজে, তাইজুল হারিয়ে যান। আবার যখন সাদা পোশাক আর লাল বলের খেলার সময় আসে, তখন টিম লিস্টে তাইজুলের নাম আসে। মাঝের সময়টায় আড়ালে থাকা অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম করে যাওয়া তাইজুলকে কেউই দেখে না। তাইজুলও বুক চাপড়ে বলে না, 'এসো, দেখো আমায়!'