কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়...

ছবি: ছবি- ক্রিকফ্রেঞ্জি

|| ক্রিকফ্রেঞ্জি করেসপন্ডেন্ট ||
২৭ জানুয়ারি, ২০১৮, বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ট্রাই নেশন ফাইনালে সাকিব আল হাসান ফিল্ডিং করতে গিয়ে ইনজুরি আক্রান্ত হন। আগে ব্যাট করা শ্রীলঙ্কার ইনিংসের ৪২তম ওভারে দীনেশ চান্দিমালকে রান আউট করার চেষ্টায় বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুলে আঘাত পান সাকিব।
সাকিবের ইনজুরির পর বিসিবি চিকিৎসক দেবাশিষ চৌধুরীর বক্তব্য, ‘আঙ্গুলের এক্স-রে করা হয়েছে। এক্স-রেতে কোনো ছিড় ধরা পড়েনি। তবে, বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুলে সেলাই দিতে হয়েছে। তাকে একজন কসমেটিক সার্জন পরীক্ষা করে দেখেছেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়েছেন।'
ফলাফলঃ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই টেস্ট, দুই টি-টুয়েন্টি খেলতে পারেন নি সাকিব। খেলতে পারেননি শ্রীলঙ্কার মাটিতে নিদাহাস ট্রফির প্রথম দুই ম্যাচ।
কামব্যাকঃ ১৬ মার্চ, নিদাহাস ট্রফিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি-টুয়েন্টি ম্যাচ দিয়ে দলে ফিরেন সাকিব। তখন সাকিবকে ক্লিনিক্যালি 'ফিট' ঘোষণা করা হয়েছিল। নিদাহাস ট্রফিতে ফাইনাল সহ তিনটি ম্যাচ খেলেন তিনি। তারপর এপ্রিল মাস জুড়ে আইপিএলে ফাইনাল পর্যন্ত মোট ১৬টি ম্যাচ খেলেছেন। আফগানিস্তানের বিপক্ষে খেলেছেন আরও তিনটি টি-টুয়েন্টি।
এরপর জুলাই-আগস্ট মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে দুই টেস্ট, তিন ওয়ানডে ও তিন টি-টুয়েন্টি খেলেছেন।
পুরনো ইনজুরির আবির্ভাবঃ ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের শেষের দিকে সাকিবের ইনজুরি আক্রান্ত আঙ্গুলের ব্যথা ফের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। দলের প্রয়োজনে ব্যথানাশক ইনজেকশন নিয়েই ওয়েস্ট ইন্ডিজে খেলেছিলেন তিনি।
ডা. দেবাশীষ তখন বলেছিলেন, 'সাকিব দ্বিতীয়বারের মতো ব্যথানাশক ইনজেকশন নিয়ে খেলছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ। এর আগে অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে নিয়েছিলেন ব্যথানাশক ইনজেকশন। এতেও যদি ব্যথা না কমে তবে অস্ত্রোপচার করতেই হবে তাকে।'

অস্ত্রোপচার নিয়ে নাটকঃ সাকিব সফল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর শেষে ৯ আগস্ট দেশে ফিরেই দ্রুত অস্ত্রোপচার করানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন। বিমান বন্দরে নেমেই বলেছিলেন, ‘ফিজিও ভালো বলতে পারবেন। এটা তো আমরা সবাই জানি যে, সার্জারি করতে হবে। ওটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে কোথায় করলে ভালো হয়, কবে করলে ভালো হয়। তবে আমি মনে করি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করে ফেলা ভালো।’
কিন্তু সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ থেকে শুরু হতে যাওয়া এশিয়া কাপে সাকিবকে চাচ্ছিল বিসিবি। একই দিন বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেছিলেন, ‘এশিয়া কাপের আগেও হতে পারে, পরেও হতে পারে। জিম্বাবুয়ে সিরিজের সময় হতে পারে। আজকে কোচের সঙ্গে যে কথা হয়েছে, ও বলেছে এশিয়া কাপের কথাই। আমি বলেছি, এশিয়া কাপের চেয়ে ভালো হয় আমরা জিম্বাবুয়ে সিরিজের সময় করি। নতুন কিছু ক্রিকেটারও দেখতে পরব আমরা। ওটাতে আমার মনে হয় ভালো হবে। এশিয়া কাপ এমনিতেই এবার কঠিন হবে। তার ওপর সাকিবের মতো একজন ক্রিকেটার না খেললে দলের মোরাল আরও উইক হয়ে যেতে পারে। তারপরও আরও কথা হবে। আজ-কালকের মধ্যে সাকিবের সঙ্গে কথা বলব। আমার মনে হয়, অন্য সময় করাটাই ভালো হবে।’
অগত্যা সাকিবকে রেখেই এশিয়া কাপের স্কোয়াড ঘোষণা করা হয়। দল ঘোষণার দুই দিন পর ৮ সেপ্টেম্বর, সাকিব বলেছিলেন, 'এখন আমি ২০-৩০ ভাগ ফিট আছি। আমার হাতে এখনো ব্যথা। অতএব সত্যিকথা বলতে আমি জানি না কীভাবে ব্যাট অথবা বল করবো। আমি কিছুদিন প্রাকটিসের বাইরে আছি অতএব জানি না (কী করবো)।' এমন বক্তব্যের কারণে বিসিবির কাছে আড়ালে জবাবদিহিতার সম্মুখীনও হতে হয়েছে সাকিবকে।
সাকিবের ইনজুরি লড়াই ও এশিয়া কাপঃ আঙ্গুলের ব্যথা নিয়েই এশিয়া কাপে চারটি ম্যাচ খেলেছেন সাকিব। ব্যাট হাতে অবদান ছিল শুন্য, কিন্ত বল হাতে সাকিব ছিলেন সাকিবের মতই। প্রতি ম্যাচেই আঙ্গুলে মোটা ব্যান্ডেজ বেঁধে খেলতে দেখা গেছে সাকিবকে। ২৬ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের বিপক্ষে মহা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে দুঃসংবাদ পাওয়া যায়। আঙ্গুলের ব্যথা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাওয়ায় দ্রুত সাকিবকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
সাকিবের দেশে ফেরা ও ইনজুরি আপডেট জানাতে গিয়ে দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজন জানিয়েছিলেন, ‘আজ বিকেল চারটার ফ্লাইটে রওনা হয়েছে সাকিব। আগামী শনি অথবা রবিবার সে মেলবোর্নের উদ্দেশে রওনা হতে পারে। তার আঙুলের অবস্থা ভালো নয়। তাই যত দ্রুত সম্ভব অস্ত্রোপচার করানো জরুরি। সামনে আমাদের একটানা খেলা। সাকিব হয়তো জিম্বাবুয়ে সিরিজ মিস করবে, তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে তাকে আমরা পেতে চাই।’
পরের দিন অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে দেশে ছাড়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু দেশে ফিরে দেখা গেল সাকিবের আঙ্গুলের বেগতিক দশা। চোট পাওয়া আঙ্গুলে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ে এবং পুঁজ জমে মারাত্মক অবস্থা ধারণ করে। এরপর দ্রুত সাকিবকে অ্যাপলো হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
২৯ সেপ্টেম্বর সাকিব নিজের অবস্থা ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, ‘কাল (পরশু) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকেরা বলেন, যত দ্রুত সম্ভব অস্ত্রোপচার করে পুঁজ বের করতে হবে। দেরি করলে বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। সংক্রমণটা আর আমার আঙুলে থাকেনি, কবজি পর্যন্ত চলে এসেছিল। ব্যথাও দ্রুত বাড়ছিল। এটা যদি আরও কয়েক দিন পর ধরা পড়ত, আমার হাতটাই অকেজো হয়ে যেতে পারত। এখানকার ডাক্তাররা দেখেই বলেছিল, ‘ওহ মাই গড! এখানে তো পুঁজ হয়ে গেছে! আপনি এত দিন ধরে কীভাবে খেলেছেন?’
‘এই অবস্থা আমার গত ১৪-১৫ দিন ধরে। এখানে একজন ডাক্তার সেটা দেখেই বুঝে গেলেন। কিন্তু এই ১৪-১৫ দিনে আমাদের ফিজিও কিছুই বুঝল না! ফিজিও সমস্যাটা ধরতে পারেনি, এটা সত্যি। একটু তো ভুল হয়েছেই। কিছুটা দায় তার ওপর অবশ্যই বর্তায়। তাই বলে সব দোষ তার ঘাড়ে দেব না। সমস্যাটা যে সংক্রমণের দিকে যেতে পারে, এটা আসলে আমরা কেউই বুঝতে পারিনি।’
ফলাফলঃ সাকিবের আঙ্গুলের ইনফেকশন সম্পূর্ণ না সারা পর্যন্ত আবশ্যক অস্ত্রোপচারের পথ এখন বন্ধ। অস্ত্রোপচার করালে প্রায় ৬-৮ সপ্তাহ সময় লাগবে, মাঠে ফিরতে। কিন্তু ইনফেকশনের জন্য আগামী ছয় মাসের মধ্যে অস্ত্রোপচার করার কোন সুযোগ নেই। সাকিব বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। সেখান থেকে ৮ অক্টোবর, নিজের ইনজুরি অবস্থা জানিয়ে তিনি বলেন,
‘ইনফেকশনের জন্য ছয় মাসের মধ্যে অস্ত্রোপচারের কোন সুযোগ নেই। ইনফেকশন থাকা অবস্থায় করলে (অস্ত্রোপচার) তো হাত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই ঝুঁকি তো কেউ নিবে না। ইনফেকশন শতভাগ নির্মূলের অপেক্ষা করতে হবে।’
‘দেড়-দুই মাস মেডিসিন চলার পর দেখতে হবে যে ইনফেকশন আবার বাড়ে কিনা। তারপর ট্রায়াল বেসিসে খেলে দেখব ব্যথা বাড়ে কিনা। তখন আরেকটি পরীক্ষার পর যদি সব ঠিক থাকে তাহলে ছয় মাস পর অস্ত্রোপচার।’
শঙ্কাঃ বিশ্বকাপের বাকী আট মাসের কম। বর্তমানে মেলবোর্নের ইপওর্থ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাকিব যদি এর মাঝে ইনফেকশন মুক্ত না হতে পারেন, তাহলে হয়তো সাকিবকে বিশ্বকাপ চলাকালে কিংবা তাঁর আগে অপারেশন করতে হবে। সেক্ষেত্রে সাকিবের বিশ্বকাপের খেলার সম্ভাবনা ক্ষীণ বললে ভুল হবে না।
কিছু প্রশ্নঃ নিদাহাস ট্রফির সময় সাকিবের চিকিৎসা কি ঠিক মত হয়েছিল? মার্চ, এপ্রিল, মে, জুন, জুলাই ও আগস্ট মাস পর্যন্ত টানা খেলায় থাকা সাকিবের পর্যবেক্ষণ কী ঠিক মত হয়েছে? ফিজিও বা বিসিবি চিকিৎসক কী নিয়মিত সাকিবের চেকআপ করেনি? করলে তাঁর ফলাফল এরুপ ভয়াবহ কিভাবে হয়? কে জানে, নিদাহাস ট্রফির সময় সঠিক চিকিৎসা পেলে হয়তো আজ দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় তারকাকে নিয়ে চিন্তা করতে হত না বোর্ডের।
ভুল একবার মানা যায়, কিন্তু বারবার ভুল গ্রহনযোগ্য নয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের পর সাকিব অস্ত্রোপচার করাতে চাইলেও বিসিবি সেটা চায়নি। আর ফিজিও থিহান চন্দ্রমোহন কী বিসিবির পক্ষেই কথা বলেছেন? তা না হলে আঙ্গুলের এমন হাল দেখেও সাকিবকে এশিয়া কাপে খেলার সবুজ সংকেত কেন দিলেন তিনি? সর্বোপরি, সাকিবের বর্তমান অবস্থার দায়ভার কে নেবে?