জীর্ণ, বিবর্ণ বোলিংয়ের দায়ভার কে নিবে?

ছবি:

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ভরাডুবির পর সকলেই এখন সাকিব, তামিমদের পিন্ডি চটকাতে ব্যস্ত। এমনকি অনেকে তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও সমালোচনা শুরু করে দিয়েছেন।
তবে যারা ব্যাটসম্যানদের সমালোচনায় মুখর হয়ে আছেন তাদের অনেকেই হয়তো খতিয়ে দেখেননি আসল বিষয়টি। ব্যাটসম্যানদের ওপর সকল দোষ চাপিয়েই তাই ক্ষান্ত হচ্ছেন তারা।
৪৩ রানে অলআউট হওয়া আসলেই অনেক লজ্জার এবং বলা যায় গুরুতর অপরাধও। তবে অ্যান্টিগার সবুজ উইকেট এবং ওভারকাস্ট কন্ডিশনে বাংলাদেশের এই পরিণতি মোটেও অবাক করা কিছু নয় বৈকি।
বরং বলা যায় বাংলাদেশের জায়গায় অন্য কোনো দেশ হলেও এই কন্ডিশনে মুখ থুবড়েই পড়তো। অবশ্যই ব্যাটসম্যানদের যে দোষ রয়েছে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বলা যায় বাংলাদেশের বোলারদেরও দিন শেষে দোষ কম নয়।
কারণ যে উইকেটে টাইগার ব্যাটসম্যানেরা রোচ, কামিন্স, হোল্ডারদের পেস অ্যাটাক সামলাতে হিমশিম খেয়েছে সেই উইকেটেই কিনা দিন শেষে মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে ২০১ রান তুলে ফেলেছে উইন্ডিজরা!
বাংলাদেশের থেকে এরই মধ্যে ১৫৮ রানের লিড নিয়ে ফেলেছে তারা। শুধু তাই নয়, ওপেনার ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েটের দরজায়ও এখন কড়া নাড়ছে ৭ নম্বর টেস্ট সেঞ্চুরি। হয়তো দ্বিতীয় দিন খেলতে নেমে সেঞ্চুরি তুলে নিতে খুব বেশি সময়ও নিবেন না ৮৮ রানে অপরাজিত থাকা এই ব্যাটসম্যান।
কে জানে, হয়তো বাংলাদেশের বিপক্ষে আগের ২১২ রানের ক্যারিয়ার সেরা ইনিংসটিকেও ছাড়িয়ে যাবেন এই ম্যাচেই। এদিকে শুধু ব্র্যাথওয়েটই নন, টাইগার বোলারদের তেমন একটা সমীহ করেননি আরেক ওপেনার ডেভন স্মিথও।
৫৮ রান করে ভালোই সঙ্গ দিয়েছিলেন তিনি ব্র্যাথওয়েটকে। পাশাপাশি গড়েছিলেন ১২৩ রানের জুটিও। বলা যায় স্মিথ এবং ব্র্যাথওয়েটের ইনিংস দুটিই সবথেকে বড় উদাহরণ টাইগারদের নিষ্প্রভ বোলিংয়ের।

বিশেষ করে রুবেল হোসেনের কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ না করলেই নয়। টানা ফুল লেংথ ডেলিভারি দেয়ার ক্ষমতা এতদিন পরে এসেও যে রুবেলের হয়নি সেটি আবারো প্রমাণিত হলো অ্যান্টিগা টেস্টে।
উল্টো বাংলাদেশের দলের এই ফ্রন্ট লাইন পেসারকে দেখে মনে হয়েছে টানা বাজে বোলিং করার ধারাবাহিকতা ভালোভাবে রপ্ত করেছেন তিনি। শুরুর দিকে কিছুটা ছন্দে থাকলেও ধীরে ধীরে বোলিংয়ের ধাঁর একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছিলো তার।
অফ ষ্ট্যাম্পের ঢের বাইরে দিয়ে একের পর এক বল করে গিয়েছেন রুবেল। যদিও ১২ ওভার বোলিং করে মাত্র ২৪ রান দিয়েছিলেন তিনি, তবে বলের লাইন এবং লেন্থ কোনোটাই তেমন আহামরি ছিলো না তাঁর।
বরঞ্চ বলা যায় রান কম দেয়ার ক্ষেত্রে রুবেলের থেকে বেশি কৃতিত্ব ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যানদের। কেননা তারা ধরে খেলার ব্রত নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন এদিন, যা তাদের খেলা দেখেই বোঝা গিয়েছিলো।
অবশ্য শুধু রুবেলকেই কাঠগড়ায় দাঁড়া করানো হয়তো ঠিক হবে না। বাকি দুই পেসার কামরুল ইসলাম রাব্বির এবং আবু জায়েদ রাহীও ছিলেন সমানভাবেই নিষ্প্রভ। রাহী ১৬ ওভার বোলিং করে ডেভন স্মিথের উইকেটটি নিয়েছিলেন বটে, তবে গুড লেন্থের বালাই ছিলো না তাঁর স্পেলেও।
যদিও অভিষেক টেস্ট বলে পার পেয়ে যেতে পারেন রাহী। তবে ৬২টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে ১৯২ উইকেট শিকার করা পেসারের ক্ষেত্রে অন্তত এই অজুহাত ধোপে টেকার মতো নয় বৈকি। একই অবস্থা রাব্বির ক্ষেত্রেও।
বরং বলা যায় বাকি দুই পেসারের সাথে বাজে বোলিংয়ের প্রতিযোগিতা করতেই এদিন মাঠে নেমেছিলেন তিনি। ১০ ওভারে ৪৫ রানে শুন্য উইকেট সেটাই যেন প্রমাণ করছে চোখে আঙ্গুল দিয়ে। এতো গেল পেসারদের কথা।
স্পিনারদের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিলো না। আগেই বোঝা গিয়েছিলো এই উইকেট থেকে খুব একটা টার্ন পাবেন না স্পিনাররা। খেলতে নেমেও সেটাই বুঝতে পেরেছেন সাকিব, মিরাজ মাহদুল্লাহরা।
তবুও ৩ ওভার হাত ঘুরিয়ে ৬ রানে ১ উইকেট নিতে সক্ষম হয়েছেন মাহমুদুল্লাহ। তবে বাকি দুই স্পিনারের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি একেবারেই। সাকিব ১২ এবং মিরাজ ১৫ ওভার বোলিং করে উইকেটের আশায় হাপিত্যেশ করে বসে থাকলেও কাজ হয়নি একেবারেই।
দিন শেষে বাংলাদেশের বোলাররা অবশ্য বাজে পারফর্মেন্সের কারণ হিসেবে উইকেটকে দায়ী করতে পারেন। কেননা দেশের মাটিতে এমন সবুজ এবং পেস সহায়ক উইকেটে খেলার অভিজ্ঞতা যে তাদের প্রায় নেই বললেই চলে।
তবে এখানেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ যখন ৪৩ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিলো তখনও উইকেট যথেষ্ট সবুজাভ ছিলো। উইকেট থেকে সেসময়েও সুবিধা পাচ্ছিলেন পেসাররা।
অন্য কোন টেস্ট খেলুড়ে দেশের পেসার হলে এই গ্রিনিশ উইকেটের সুবিধা কাজে লাগিয়েই পার্থক্য গড়ে দিতে চাইতেন। কিন্তু বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে সেই তাগিদেরও অভাব প্রকটভাবে ফুটে উঠেছিলো।
যার দরুন জঘন্য বোলিংয়ের এক উজ্জ্বল নিদর্শনই রেখেছে তারা। আর স্বাগতিকদের সুযোগ করে দিয়েছে রানের এভারেস্ট গড়ার। দ্বিতীয় দিন শেষে যে ক্যারিবিয়ানরা তাদের লিড কোথায় নিয়ে যাবে সেটা চিন্তা করলে হয়তো অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের থরহরি কম্পমান অবস্থা সৃষ্টি হবে।