নয়শ মাইলের ছক্কা, ছয় ঘণ্টার টেস্ট, হ্যাটট্রিকের ডাবল ও আরও কত কি!

ছবি:

বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বের দুই পরাশক্তির নাম অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে দেশ দুটির মধ্যবর্তী দ্বৈরথের ইতিহাসটা কিন্তু বেশ পুরনো। সেই ১৯০২ সালে নিজেদের মধ্যে প্রথম টেস্ট, প্রথম সিরিজ খেলেছিল দু'দল।
আজকের আয়োজনে থাকছে অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বৈরথের কিছু ঐতিহাসিক খন্ডচিত্র।
১.
১৯০২ সালে জোহানেসবার্গের ওয়ান্ডারার্সে টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবারের মত মুখোমুখি হয়েছিল দু'দল। সেই ম্যাচেরই একটি ঘটনা বলছি।
দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। লেগ স্পিনিং অলরাউন্ডার ওয়ারউইক আর্মস্ট্রংয়ের বলে বিশাল এক ছক্কা হাঁকালেন প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান জিমি সিনক্লেয়ার। মাঠ, বাউন্ডারি, গ্যালারি, স্টেডিয়াম ছাড়িয়ে বলটি পাড়ি জমাল অজানার পথে! অনেক খোঁজাখুজি করেও যখন বলটি পাওয়া গেল না, তখন অগত্যা নতুন বল দিয়েই আবার শুরু করতে হল খেলা।
আশ্চর্যের বিষয় হল, বলটার সন্ধান কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছিল তবে দুই দিন পর! গন্তব্য পোর্ট এলিজাবেথ স্টেশন! ওয়ান্ডারার্স থেকে যার দুরত্ব ৯৫৬ মাইল!
উল্লেখ্য, স্টেডিয়ামের ঠিক পাশেই ছিল রেলস্টেশন। কোন এক অজানা কারণে গিয়ে বলটি গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল পোর্ট এলিজাবেথগামী একটি চলন্ত মালবাহী ট্রেনে!
২.
১৯৩২ সালের মেলবোর্ন টেস্টের ঘটনা। যে ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাতে অস্ট্রেলিয়ার সময় লেগেছিল মাত্র ৫ ঘণ্টা ৫৩ মিনিট!
১২ ফেব্রুয়ারি শুরু মেলবোর্ন টেস্ট শেষ হয়েছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি। তারিখের হিসাব দেখলে মনে হবে ম্যাচটি শেষ হয়েছে চার দিনে। কিন্তু সে সময় টেস্টে এক দিনের বিরতি থাকত। তা ছাড়া বৃষ্টির কারণেও ম্যাচে দীর্ঘ সময় বিরতি ছিল। সেই টেস্টে সব মিলিয়ে মাঠে খেলা হয়েছিল ছয় ঘন্টারও কম!
টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করে ২৩.২ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকা অলআউট হয়েছিল মাত্র ৩৬ রানে। জবাবে অস্ট্রেলিয়া ৫৪.৩ ওভার খেলে করেছিল ১৫৩ রান। ১১৭ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ৩১.৩ ওভারে মাত্র ৪৫ রানে অলআউট হয়ে ম্যাচটি ইনিংস ব্যবধানে হেরে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা।
সব মিলিয়ে ১০৯.২ ওভার অর্থাৎ ৬৫৬ বল খেলা হয়েছিল ম্যাচটাতে। জয় পরাজয় নিষ্পত্তি হয়েছে এমন ম্যাচগুলোর মধ্যে 'বলের হিসাবে' এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে স্বল্প আয়ুর টেস্ট!
অদ্ভুত এই ম্যাচটা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার অস্ট্রেলিয়া সফরের শেষ ম্যাচ। পাঁচ ম্যাচ সিরিজে আগের চারটাতেই হেরেছিল প্রোটিয়ারা। হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর লড়াইয়ে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক জক ক্যামেরন। অন্যদিকে সফরকারীদের হোয়াইটওয়াশ করার লক্ষ্যে অস্ট্রেলিয়ান বোলাররাও ছিলেন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। মেলবোর্নের পিচকে যারা পরিণত করেছিলেন মৃত্যুকূপে! যার ভয়াবহতার শিকার হয়েছিলেন প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানরা!
এবারে আসি ম্যাচটা শেষ হতে কেন চারদিন লেগেছিল সেই প্রসঙ্গে। ১২ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া টেস্টের প্রথম দিনটা প্রোটিয়াদের জন্য শুরু হয়েছিল দুঃস্বপ্ন দিয়ে। অস্ট্রেলিয়াও ১৫৩ রানে অলআউট হয়ে গেলে প্রথম দিনেই ম্যাচের তৃতীয় ইনিংস শুরু হয়ে যায়। ১ উইকেটে ৫ রান নিয়ে দিনের খেলা শেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকা।
১৩ ফেব্রুয়ারি তুমুল বৃষ্টির কারণে খেলা হয়নি। ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল টেস্টটির 'রেস্ট ডে'। ১৫ ফেব্রুয়ারি তৃতীয় দিনে দক্ষিণ আফ্রিকা যখন ব্যাট করতে নামে তখন ঘড়িতে দুইটা বেজে ১৮ মিনিট। দুই দিনের বৃষ্টিতে আউটফিল্ডের অবস্থা খারাপ থাকায় এই বিলম্বে শুরু। বিলম্বিত এই শুরুও অবশ্য বাঁচাতে পারেনি আফ্রিকান দেশটিকে। উইকেটের অবস্থা যে তখন রীতিমতো মাইনফিল্ড!
অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক বিল উডফুল দুই প্রান্ত থেকেই শুরু করলেন স্পিন আক্রমণ। প্রথম ইনিংসে ৬ রানে ৫ উইকেট নেওয়া 'বাঁহাতি স্লো মিডিয়াম কাম বাঁহাতি স্পিনার' বার্ট আয়রনমঙ্গার এবার ১৮ রানে নেন ৬ উইকেট! একই টেস্টে দ্বিতীয়বারের মত পঞ্চাশের নিচে অলআউট হয়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা। দুই ইনিংস মিলিয়ে ম্যাচে তাদের সংগ্রহ ছিল মাত্র ৮১ রান! যেটি দুই ইনিংস মিলিয়ে টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে কম রানের রেকর্ডও বটে!
৩.
টেস্ট ক্রিকেটে দুই ইনিংসেই হ্যাটট্রিক করার একমাত্র কীর্তিটি সাবেক অস্ট্রেলিয়ান লেগ স্পিনার জিমি ম্যাথুসের। ১৯১২ সালে ইংল্যান্ডের ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অবিশ্বাস্য এই কীর্তিটি গড়েছিলেন ম্যাথুস। মজার ব্যাপার হল, দুটো হ্যাটট্রিকই এসেছিল একই দিনে! ৩রা মে তারিখে।

শুধু তাই নয়, দুটো হ্যাটট্রিকই তিনি পূর্ণ করেছিলেন 'অভিষিক্ত' প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান টমি ওয়ার্ডকে আউট করে! মানে দুবারই ওয়ার্ড ছিলেন তাঁর 'হ্যাটট্রিক' বলের শিকার! বেচারা ওয়ার্ডকে অভিষেকেই বরণ করতে হয়েছিল 'কিং পেয়ার' এর লজ্জা!
৪.
১৯২১ সালের ১২ নভেম্বর। জোহানেসবার্গ টেস্টের প্রথম দিন লাঞ্চ বিরতিতে যাবার আগে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ছিল ২৭ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে ৮৩ রান। অথচ তখনও পর্যন্ত প্রোটিয়া বোলারদের কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারে নি এরপরে কী অপেক্ষা করছে তাদের সামনে!
লাঞ্চের পর চা বিরতির আগ পর্যন্ত খেলা হয়েছিল দুই ঘন্টা। এই দুই ঘন্টায় রীতিমতো তান্ডব চালিয়েছিলেন দুই অজি ব্যাটসম্যান জ্যাক গ্রেগরি ও হার্বি কলিন্স। এই দু'জনের ঝড়ো ব্যাটিংয়ের কল্যাণে এক সেশনে ২৪০ রান তুলেছিল অস্ট্রেলিয়া যা আজ পর্যন্ত কোন টেস্ট ম্যাচের এক সেশনে তোলা সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ড!
উল্লেখ্য, ওই সেশনেই মাত্র ৬৭ বলে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে টেস্ট ইতিহাসের দ্রুততম সেঞ্চুরির কীর্তি গড়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান জ্যাক গ্রেগরি; যে রেকর্ড টিকে ছিল প্রায় ৮৬ বছর! অবশ্য মিনিটের হিসাবে (৭০ মিনিট) ইনিংসটি আজও টেস্ট ক্রিকেটের দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড।
সেশন শেষে ৭৮ বলে ১১৩ রান করে অপরাজিত ছিলেন চারে নামা গ্রেগরি; ১৯টি বাউন্ডারির সাথে ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন ২টি। অন্যপ্রান্তে তাঁকে দারুণ সঙ্গ দেয়া ওপেনার হার্বি কলিন্সের সংগ্রহ ছিল ১৩৩* রান। কিছুটা ধীরে সুস্থে খেলা কলিন্স অবশ্য শেষ পর্যন্ত পেয়েছিলেন ডাবল সেঞ্চুরি (২০৩); ২৬টি চারের সাহায্যে।
৫.
১৯৩১ সালের ব্রিসবেন টেস্টের প্রথম দুই দিন খেলা হওয়ার পর নামে মুষলধারে বৃষ্টি। তৃতীয় ও চতুর্থ দিনের খেলা পুরোটাই ভেসে গিয়েছিল বৃষ্টিতে। অবশেষে পঞ্চম দিন চা বিরতির পর আবার শুরু হয় খেলা।
দক্ষিণ আফ্রিকা দিনের খেলা শুরু করেছিল ৩ উইকেটে ১২৬ রান নিয়ে, শেষ করেছিল ৬ উইকেটে ১৫২ রানে। এক সেশনে মাত্র ২৬ রান! ভাবছেন এ আর এমন কী! কিন্তু যখন শুনবেন যে শেষ সেশনে খেলা হয়েছিল ৪৬ ওভার, চোখ কপালে না তুলে উপায় আছে!
দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটসম্যান ব্রুস মিচেল তার আগের দিনের অপরাজিত ৩৭ রানের সাথে যোগ করতে পেরেছিলেন মাত্র ৮ রান! ৪৫ রানে অপরাজিত থাকা অবস্থায় কোন রান না করেই কাটিয়ে দিয়েছিলেন পাক্কা ৯০ মিনিট!
ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া জিতেছিল এক ইনিংস ও ১৬২ রানে।
ভাবছেন পাঁচ দিনের খেলা শেষ হওয়ার পরেও কীভাবে ম্যাচে রেজাল্ট এসেছিল! আসলে তখন চলছিল টাইমলেস টেস্টের যুগ। ম্যাচের ফলাফল আসা না পর্যন্ত অবিরাম খেলা চলতেই থাকত। ওই ম্যাচটিতে তাই রেজাল্ট আসা অব্দি অপেক্ষা করতে হয়েছিল সাত দিন!
৬.
আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরত আসলেন এক ব্যাটসম্যান। খানিক পরেই উইকেট পড়ল আরেকটা, আরেকবার উল্লাসে মেতে উঠল ফিল্ডিং দল। ধীরে সুস্থে ড্রেসিংরুমে ফিরে যাচ্ছেন আউট হওয়া ব্যাটসম্যান। কিন্তু দর্শকদের মাঝে কৌতুহল, আরে এই একই ব্যাটসম্যানই তো আউট হলো একটু আগে! ব্যাটসম্যান একজন, কিন্তু আউট হলেন দুই বার! পরপর দুই বার একই ব্যাটসম্যান আউট হন কীভাবে!
অবিশ্বাস্য লাগছে? অবিশ্বাস্য মনে হলেও এমনটাই ঘটেছিল ১৯১১ সালে সিডনি টেস্টে। টেস্ট ক্রিকেটে একই ব্যাটসম্যানের পরপর দুই বার আউট হওয়ার সর্বপ্রথম ঘটনা এটি।
১৯১১ সালের সিডনি টেস্টের দ্বিতীয় দিন। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের সংগ্রহ ৩৬৪ রানের জবাবে ধুঁকতে থাকা প্রোটিয়ারা অলআউট হয়েছিল মাত্র ১৬০ রানে। দিনের খেলা শেষ হতে তখনও বাকি ৯ ওভার।
উল্লেখ্য, প্রথম ইনিংসে দশ নম্বরে ব্যাট করতে নেমেছিলেন প্রোটিয়া অধিনায়ক পার্সি শেরওয়েল। মাত্র ৫ রান করে 'শেষ ব্যাটসম্যান' হিসেবে আউট হওয়া ব্যাটসম্যানও তিনিই।
মজার ব্যাপার হল, ফলোঅনে পড়ে ওইদিনই আবার ব্যাটিংয়ে নামতে হয়েছিল সফরকারী দলটিকে। ফলোঅনে পড়া দলকে বাঁচাতেই কি না, পরের ইনিংসে 'ওপেন' করতে নেমে গেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার 'অধিনায়ক কাম উইকেটরক্ষক' পার্সি শেরওয়েল! কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! মাত্র ১১ মিনিটের ব্যবধানে দুইবার আউট হওয়ার লজ্জায় পড়তে হয়েছিল তাঁকে! টেস্ট ইতিহাসে সবচাইতে কম সময়ের ব্যবধানে দুইবার আউট হওয়ার ঘটনা এটাই।
তার চেয়েও বড় কথা, একই ম্যাচে পর পর দুই বার আউট হওয়া ইতিহাসের 'প্রথম' ব্যাটসম্যান হিসাবে রেকর্ডবুকে নাম লিখিয়েছিলেন পার্সি শেরওয়েল।
ওই ম্যাচে আরেকটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটসম্যান অর্মি পিয়ার্স প্রথম ইনিংসে নেমেছিলেন ওপেনিংয়ে অর্থাৎ এক নম্বর পজিশনে, আর দ্বিতীয় ইনিংসে নেমেছিলেন এগারো নম্বরে!
৭.
দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসে জিমি সিনক্লেয়ার নামটা মোটেও ভুলে যাওয়ার মত কেউ নন। ইতিহাসের সবচাইতে আগ্রাসী ও বিপজ্জনক হার্ডহিটারদের একজন মনে করা হয় তাঁকে। টেস্ট ক্রিকেটে দেশটির পক্ষে প্রথম শতরানের কীর্তিটিও ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি লম্বা বিশালদেহী এই ক্রিকেটারের দখলে! শুধু তাই নয়, টেস্ট ইতিহাসে একই ম্যাচে সেঞ্চুরি ও ৫ উইকেট দখল করা 'প্রথম' ক্রিকেটার হলেন জিমি সিনক্লেয়ার।
তাছাড়া ১৯০২ সালের জোহানেসবার্গ টেস্টে তাঁর অবিশ্বাস্য 'ছক্কাকান্ডের' কীর্তি তো জায়গা করে নিয়েছে ইতিহাসে!
১৯০২ সালের ওই সিরিজেরই তৃতীয় ম্যাচের ঘটনা। কেপটাউনে সফরকারী অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে করা ২৫২ রানের জবাবে প্রোটিয়ারা গুটিয়ে যায় মাত্র ৮৫ রানে। চার নম্বরে নামা সিনক্লেয়ার আউট হয়েছিলেন ০ রানে।
দ্বিতীয় ইনিংসে ফলোঅন করতে নেমে অবশ্য কিছুটা লড়াইয়ের আভাস দিয়েছিল স্বাগতিকরা। ২২৫ রানে অলআউট হবার আগে সে যুগের বিখ্যাত 'হার্ডহিটার'দের একজন,জিমি সিনক্লেয়ার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্ট সেঞ্চুরিটা তুলে নিয়েছিলেন মাত্র ৮০ মিনিটে!
বলের হিসাব পাওয়া না গেলেও ইতিহাসবিদদের মতে ওটা ছিল টেস্ট ইতিহাসের দ্রুততম সেঞ্চুরিগুলোর একটা। ৮০ মিনিট স্থায়ী ১০৪ রানের 'বিস্ফোরক' ইনিংসটি খেলার পথে ৬টি বিশাল ছক্কা মেরেছিলেন সিনক্লেয়ার!
৮.
পুড থার্লো নামে অস্ট্রেলিয়ার একজন অখ্যাত ফাস্ট বোলার ছিলেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে যিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন ভয়ংকর গতির জন্য। বেচারা থার্লোর দুর্ভাগ্য যে, মাত্র এক টেস্টেই থেমে গিয়েছিল তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই এক ম্যাচে ব্যাটসম্যান, বোলার কিংবা ফিল্ডার হিসেবে তাঁর অবদান ছিল শূন্য! একটা রান, উইকেট কিংবা ক্যাচ কিছুই ছিল না তাঁর অর্জনের ঝুলিতে।
তারপরেও তিনি ক্রিকেট ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন একটি বিশেষ কারণে। ব্যক্তিগত কোন অর্জন নয়, বরং তাঁর 'বোকামি'তেই নিশ্চিত একটি ট্রিপল সেঞ্চুরি হাতছাড়া করেছিলেন স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। ২৯৯ রানে অপরাজিত থাকার আক্ষেপে পুড়তে হয়েছিল তাঁকে।
১৯৩২ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের চতুর্থ টেস্টটা হয়েছিল অ্যাডিলেডে। সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে স্কোর যখন ৪৯৯/৯, তখন ১১ নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে ব্যাটিংয়ে নামলেন 'অভিষিক্ত' পুড থার্লো। অপরপ্রান্তে অপরাজিত ২৮৬ রান নিয়ে ব্যাট করছিলেন স্যার ডন ব্র্যাডম্যান।
টানা তিন বাউন্ডারিতে ব্র্যাডম্যান মুহূর্তের মধ্যেই পৌঁছে যান ২৯৮ রানে। বোলার ছিলেন সিরিল ভিনসেন্ট। ওভারের শেষ বলটা লেগ সাইডে পুশ করেই সিঙ্গেলের জন্য দৌড় দিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল এক রান নিয়ে স্ট্রাইকটা হাতে রাখবেন।
প্রথম রানটা নিতে বেশ দ্রুততার সাথেই দৌড়েছিলেন দুই ব্যাটসম্যান। কিন্তু সিঙ্গেল সম্পন্ন হওয়ার পর যখন দেখা গেল ফিল্ডার তখনও ছুটছেন বলের পেছনে; ব্র্যাডম্যান একবার ভাবলেন দ্বিতীয় রানটাও সেরে ফেলা যায় কিনা! যেই ভাবা সেই কাজ! দ্বিতীয় রানের জন্য যেই না পেছনে ঘুরে তাকিয়েছেন, দেখলেন অপর প্রান্ত থেকে অনেক আগেই দৌড় শুরু করে দিয়েছেন থার্লো! এমনকি হাফ ক্রিজও অতিক্রম করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই। ওদিকে বলও ফিল্ডারের হাতে। ব্র্যাডম্যান বুঝে গেলেন তার পক্ষে স্ট্রাইকিং প্রান্তে পৌঁছানো অসম্ভব।
ব্র্যাডম্যান থার্লোকে হাত নেড়ে ইশারা করলেন ফিরে যেতে। কিন্তু থার্লো এতটাই কাছে চলে এসেছিলেন যে ফেরার কোন পথই আর খোলা ছিল না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সিড কার্নোর সরাসরি থ্রোতে রান আউট হয়ে গেলেন পুড থার্লো।
২৯৯ রানে অপরাজিত স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান কেবল অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন ভাঙা স্টাম্পের দিকে!