শেষ ওভারের নাটকীয়তায় শিরোপা হাতছাড়া টাইগারদের

ছবি:

সৌম্য সরকারের শেষ বলটি কাভার অঞ্চল দিয়ে উড়িয়ে সীমানা ছাড়া করে বুনো উল্লাসে মেতে উঠলেন ভারতীয় উইকেট রক্ষক ব্যাটসম্যান দীনেশ কার্তিক। এক পাশে কার্তিক উল্লাসে ফেটে পড়ছেন, ঠিক তাঁর পাশেই দেখা গেলো টাইগার অধিনায়ক সাকিব আল হাসানকে।
ক্ষণিকের জন্য যেন হতাশায় নুইয়ে পড়া ক্লান্ত এক অধিনায়কের প্রতিচ্ছবিই ফুটে উঠলো তাঁর মুখে। অবশ্য সেটি হবেই বা না কেন? এই নিয়ে পঞ্চমবারের মতো যে কোনো ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে উঠে শিরোপা স্বপ্ন ভঙ্গ হলো বাংলাদেশের!
তবে দৃশ্যপট ভিন্নও হতে পারতো। নিদাহাস ট্রফির শিরোপা জিতে উল্লাসের মাততে পারতেন সাকিবরাও। কিন্তু সেটি হতে দেননি দীনেশ কার্তিক নামক এক ব্যাটিং ঝড়। যার ৮ বলে ২৯ রানের ক্যামিওতে অবিশ্বাস্য এক জয় নিয়েই মাঠ ছেড়েছে রোহিত শর্মার দল।
সৌম্য সরকারের শেষ ওভারে জয়ের জন্য ভারতের প্রয়োজন ছিলো ১২ রান। ক্রিজে অপরাজিত ছিলেন বিজয় শঙ্কর এবং উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান কার্তিক। সেই ওভারের প্রথম বলটি ওয়াইড দেয়ার পরের বলটিতে কোনো রান দেননি সৌম্য। এরপর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বলে মাত্র ২ রান দেন তিনি। কিন্তু চতুর্থ বলে থার্ড ম্যান অঞ্চল দিয়ে চার হাঁকান বিজয়।
তবে পঞ্চম বলে লং অন দিয়ে সৌম্যকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে মেহেদি হাসান মিরাজের হাতে ধরা পরেন ভারতীয় ব্যাটসম্যান। ফলে শেষ বলে জয়ের জন্য ভারতের প্রয়োজন ছিলো ৫ রান। একটু কৌসুলি বোলিং করলে অথবা ইয়র্কার দিতে পারলে হয়তো বলটিতে ওভার বাউন্ডারি হাঁকাতে ব্যর্থ হতেন দীনেশ কার্তিক।
কিন্তু কার্তিকের সামনে শেষ বলটি করার আগে যে বেশ স্নায়ুচাপে ভুগছিলেন সৌম্য সেটি তাঁর মুখভঙ্গি দেখেই বোঝা গিয়েছিলো। আর সেই কারণেই হয়তো তাঁকে একটি সহজ বল দিয়ে বসলেন তিনি। আর কার্তিকও কাভার অঞ্চল দিয়ে বলটিকে সীমানা ছাড়া করতে ভুল করলেন না। ফলে দলকে রুদ্ধশ্বাস এক জয় এনে দিয়ে মাঠ ছাড়লেন তিনি। আর আবারো শিরোপা হারানোর আক্ষেপে পুড়তে হলো লাল সবুজের দলকে।
এদিন অবশ্য শুরুতে বাংলাদেশের ব্যাটিং মোটামুটি ভালোই হয়েছিলো। বিশেষ করে সবথেকে ইতিবাচক দিক ছিলো সাব্বির রহমানের বড় ইনিংস খেলা। মাত্র ৫০ বলে ৭০ রানের ঝড়ো একটি ইনিংস খেলেছিলেন এদিন সাব্বির।
আর সাব্বিরের এই ইনিংসে ভর করেই ম্যাচের শুরুতে ব্যাটিং করতে নেমে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৬৬ রান সংগ্রহ করেছিলো বাংলাদেশ দল। দলের পক্ষে সাব্বির শেষের দিকে মেহেদি হাসান মিরাজ খেলেছিলেন ৭ বলে ১৯ রানের একটি ক্যামিও।
টাইগারদের ছুঁড়ে দেয়া ১৬৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই এই দুই ওপেনার রোহিত শর্মা এবং শিখর ধাওয়ান দলকে ঝড়ো সূচনা এনে দিয়েছিলেন। সাকিবের প্রথম ওভারে ৭ রান নিলেও দ্বিতীয় ওভারে মেহেদি হাসান মিরাজের দ্বিতীয় ওভারে ১৭ রান নেন অধিনায়ক রোহিত।
মিরাজের ওভারে ২ টি ছয় এবং ২টি চার মারেন তিনি। তবে এরপর তৃতীয় ওভারে আবারো বোলিংয়ে এসেই শিখর ধাওয়ানের উইকেটটি তুলে নিয়ে ব্রেক থ্রু এনে দেন অধিনায়ক সাকিব। মিড অন অঞ্চলে বিকল্প ফিল্ডার আরিফুল হকের হাতে ধাওয়ানকে ক্যাচ বানিয়ে সাজঘরে পাঠান তিনি।

ডাউন দ্যা উইকেটে এসে ফ্লিক করতে গিয়ে আরিফুলের তালুবন্দি হন ভারতীয় ওপেনার। সাকিবের ঠিক পরের ওভারেই আঘাত হানেন পেসার রুবেল হোসেন। দারুণ একটি বলে নতুন ক্রিজে নামা সুরেশ রায়নাকে উইকেটরক্ষক মুশফিকের তালুবন্দি করান তিনি।
বলটি খালি চোখে দেখে ওয়াইড মনে হওয়ায় শুরুতে ওয়াইডই দিয়েছিলেন আম্পায়ার। কিন্তু অধিনায়ক সাকিব রিভিউ নেয়ায় পরবর্তীতে দেখা যায় রায়নার ব্যাটে হালকা ছুঁয়ে গিয়েছিলো বলটি। ফলে রিভিউটি পক্ষেই গিয়েছে বাংলাদেশের।
তবে রায়না ও ধাওয়ানের উইকেট দুটি হারালেও খুব একটা বিপদে পড়েনি ভারতকে। কেননা ক্রিজে এখনো টিকে আছেন অধিনায়ক রোহিত শর্মা। আর তাঁর সাথে ব্যাটিংয়ে যোগ দিয়েছেন লোকেশ রাহুল। এই দুই ব্যাটসম্যানের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই কব্জায় নিয়ে এসেছিলো ভারত। মাত্র ৯ ওভারে ৮০ রান তুলে ফেলেছিলো তারা।
তবে এরপরেই নিজের তৃতীয় তম ওভারের তৃতীয় বলে লোকেশ রাহুলকে ফিরিয়ে দিয়ে রোহিত শর্মার সাথে তাঁর ৫১ রানের জুটিটি ভেঙ্গে দেন টাইগার পেসার রুবেল। ডিপ স্কয়ার লেগ অঞ্চলে রুবেলের শর্ট বলটি পুল করতে গিয়ে সাব্বির রহমানের হাতে ধরা পড়েন রাহুল। ১ ছয় এবং ২ চারের সাহায্যে মাত্র ১৪ বলে ২৪ রান করে আউট হন তিনি।
কিন্তু রাহুল ফিরলেও সাকিবদের গলার কাঁটা হয়ে ঠিকই তখনও ক্রিজে ছিলেন অধিনায়ক রোহিত শর্মা। মাত্র ৩৫ বলে দারুণ একটি হাফসেঞ্চুরিও তুলে নেন তিনি। অবশ্য এরপরে আর বেশীক্ষণ টিকতে পারেননি তিনি। রোহিতকে ফিরিয়ে দিয়ে দলকে অবশেষে স্বস্তি এনে দিতে সক্ষম হন স্পিনার নাজমুল ইসলাম অপু।
১৪তম ওভারের দ্বিতীয় বলে অপুকে তুলে মারতে গিয়ে লং অন অঞ্চলে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের তালুবন্দি হন রোহিত। আর এরই সাথে পরিসমাপ্তি ঘটে তাঁর ৪২ বলে ৫৬ রানের ঝড়ো ইনিংসটির। এই ইনিংসটি খেলতে ৪টি চার এবং ৩টি ছয় হাঁকিয়েছেন তিনি।
রোহিত ফিরলে বিজয় শঙ্কর এবং মনিষ পান্ডে জুটি গড়েন ৩৫ রানের। এরপর ১৮ তম ওভারের শেষ বলে মনিষ পান্ডেকে লং অনে সাব্বির রহমানের হাতে তালুবন্দি করান মুস্তাফিজ। এরপরেও শেষ রক্ষা হয়নি অবশ্য। পান্ডে ফিরলে ক্রিজে এসেই রুবেলের ১৯ তম ওভার থেকে ২২ রান নেন ভয়ংকর দীনেশ কার্তিক।
ফলে শেষ ওভারে জয়ের জন্য দরকার পড়ে ১২ রান। আর সেই জয় তুলে নিয়ে তবেই মাঠ ছেরেছেন কার্তিক। শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকেছেন মাত্র ৮ বলে ২৯ রান নিয়ে। যেখানে ছিলো ৩টি ছয় এবং ২টি চারের মার।
বাংলাদেশের ইনিংস-
এর আগে এই ম্যাচের শুরুতে ভারতের আমন্ত্রণে ব্যাটিং করতে নেমে বাংলাদেশ দলের দুই ওপেনার তামিম ইকবাল ও লিটন কুমার দাসের ব্যাটে দাপুটে শুরু পেয়েছিলো টাইগাররা। তবে লিটন কুমার দাস দলীয় ২৭ রানের মাথায় ৯ বলে ১১ রান করে ওয়াশিংটন সুন্দরের বলে রায়নার হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হলে জুটি ভাঙ্গে বাংলাদেশের।
এরপর শার্দুল ঠাকুরের বলে ১৩ বলে ১৫ রান করা তামিমকে সীমানার কাছে শার্দুল ঠাকুরের চোখ জুড়ানো ক্যাচে ফিরিয়েছেন চাহালের বলে।একই ওভারে মাত্র ১ রান করে ধাওনের ক্যাচে আউট হয়েছেন সৌম্য সরকার। চতুর্থ উইকেট জুটিতে মুশফিক-সাব্বিরের ব্যাটে রান বাড়াতে থাকে টাইগাররা। কিন্তু ১২ বলে ৯ রান করে চাহালের বলে মুশফিক শঙ্করের হাতে ক্যাচ দিলে এই দুর্দান্ত জুটি ভাঙে।
এরপর সাব্বিরের সাথে যোগ দেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। কিন্তু সাব্বিরের সাথে ভুল বোঝাবুঝিতে ২১ রান করে রান আউট হয়ে সাজঘরে ফেরেন রিয়াদ। তবে রিয়াদ ফিরলেও সাকিবকে সঙ্গে নিয়ে মাত্র ৩৭ বলে দুর্দান্ত এক অর্ধশতক তুলে নেন সাব্বির।
সাব্বিরের ফিফটির পর অধিনায়ক সাকিব রান আউট হয়ে সাজঘরে ফিরে যান ৭ রান করে। আর সাব্বির শেষ পর্যন্ত ৭৭ রান করে উনাদকাটের বলে বোল্ড হয়ে আউট হয়েছেন। সাব্বির ফেরার পর ইনিংসের শেষের দিকে মেহেদী হাসান মিরাজ ৭ বলে ঝড়ো ২৫ এ চ্যালেঞ্জিং স্কোর গড়ে টাইগাররা।
বাংলাদেশ একাদশ-
তামিম ইকবাল, সৌম্য সরকার, লিটন কুমার দাস, সাব্বির রহমান, মুশফিকুর রহিম (উইকেটরক্ষক), মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ (অধিনায়ক), সাকিব আল হাসান (অধিনায়ক), নাজমুল ইসলাম অপু, মেহেদি হাসান মিরাজ, মুস্তাফিজুর রহমান, রুবেল হোসেন।
ভারত একাদশ-
রোহিত শর্মা (অধিনায়ক), শিখর ধাওয়ান, সুরেশ রায়না, দীনেশ কার্তিক, লোকেশ রাহুল, মনিষ পান্ডে, বিজয় শঙ্কর, ওয়াশিংটন সুন্দর, শার্দূল ঠাকুর, যুবেন্দ্র চাহাল, জয়দেব উনাদকাট।