মোহাম্মদ রফিকঃ আমাদের প্রথম সুপারস্টার

ছবি: ফ্রাইডে স্পেশাল

|| ফ্রাইডে স্পেশাল ||
১৯৯৬ বিশ্বকাপের পর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে প্রিমিয়ার ডিভিশনে খেলতে একবার ঢাকায় এসেছিলেন 'মাতারা হারিকেন' খ্যাত লঙ্কান সুপারস্টার সনাৎ জয়াসুরিয়া। তখন মোহামেডান দলেও নাকি একটা 'লোকাল' জয়াসুরিয়া ছিল। সেও ছিল বাঁহাতি ব্যাটসম্যান আর ব্যাটিং স্টাইলটাও ছিল জয়াসুরিয়ার মত আগ্রাসী ধাঁচের। জয়াসুরিয়ার মত সেও ছিল বাঁহাতি স্পিনার। আন্তর্জাতিক ম্যাচে শ্রীলঙ্কার হয়ে ব্যাট এবং বল হাতে জয়াসুরিয়া যে অলরাউন্ড রোলটা প্লে করতেন মোহামেডানের হয়েও একই কাজ করত সে।
সেবার ঢাকা প্রিমিয়ার লীগের কয়েকটা ম্যাচে জয়াসুরিয়ার সাথে ওপেন করার সৌভাগ্য হয়েছিল তার। দুই 'জয়াসুরিয়া' যখন একসাথে ব্যাটিংয়ে নামত তখন দুজনের মধ্যে একটা অলিখিত প্রতিযোগিতা চলত কে কতটা নির্দয়ভাবে বোলারদের পেটাতে পারে। দ্রুত রান তোলায় একজন আরেকজনকে ছাড়িয়ে যাবার চ্যালেঞ্জটা ছিল সত্যিই রোমাঞ্চকর। এদিকে উইকেটের দুইপ্রান্ত থেকেই মারমার কাটকাট ব্যাটিংয়ের তান্ডবে বোলারদের তখন 'ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি' অবস্থা! শুনলে আশ্চর্য হবেন যে, বিশ্বের তাবৎ বাঘা বাঘা বোলারদের যিনি এক নিমিষে পিটিয়ে ছাতু বানিয়ে ফেলতেন, সেই জয়াসুরিয়াকেও দ্রুত রান তোলার চ্যালেঞ্জে বেশ ক'বার হার মানতে হয়েছিল 'আমাদের' জয়াসুরিয়ার কাছে। আপনাদের নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝতে আর বাকি নেই যে কার সম্পর্কে বলা হচ্ছে। তিনি আর কেউ নন; আমাদের সবার প্রিয়, বাংলাদেশ ক্রিকেটের জীবন্ত কিংবদন্তী, এক সময়ের ড্যাশিং অলরাউন্ডার মোহাম্মদ রফিক।
ক্রিকেট নিয়ে আমার প্রথম ভালোলাগার নাম ছিল রফিক। প্রথমদিকে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের মধ্যে এক রফিকের ব্যাটিংটাই দেখতাম মনোযোগ সহকারে। রফিক কখন ব্যাট করতে নামবে সেই অপেক্ষায় অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতাম টিভিসেটের সামনে। রফিক ক্রিজে আসামাত্র ধমনীতে অ্যাড্রেনালিন রাশ আরম্ভ হয়ে যেত।
বেশিরভাগ সময় লোয়ার অর্ডারে ব্যাটিং করতেন বলে রফিককে নিয়ে আমাদের সাধারণ দর্শকদের মাঝে একটা হতাশা কাজ করত। খুব করে চাইতাম রফিককে যেন নিয়মিত ওপেনিং বা টপ অর্ডারে খেলানো হয়। আর বোলিংটা তো সবসময়ই ভাল লাগত বিশেষ করে ওনার অ্যাকশনটা। স্পিনারদের মধ্যে এত চমৎকার স্টাইলিশ বোলিং অ্যাকশন খুব কমই দেখেছি।
একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। ২০০৩ সালের কথা। ডেভ হোয়াটমোর কোচ ছিলেন তখন। ঢাকায় ইংল্যান্ডের সাথে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের খেলছিলাম আমরা। একটা ম্যাচে বাংলাদেশ খুবই স্লো ব্যাটিং করছিল যা দর্শকদের জন্য চরম বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ৩৯ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ যখন মাত্র ৮০ রান ঠিক তখনই ক্রিজে আসলেন মোহাম্মদ রফিক। মনে আছে রফিক ব্যাটিংয়ে নামার সময় কী তুমুল হর্ষধ্বনিতে গর্জে উঠেছিল পুরো স্টেডিয়াম! নাহ দর্শকদের সেদিন হতাশ করেন নি রফিক! ৪ বাউন্ডারিতে ২৭ বলে ৩৩ রানের বিনোদনদায়ী এক ইনিংস খেলে দলের স্কোর নিয়ে যান একশ'র ওপরে। রফিকের 'ক্যামিও'তে ভর করেই ৫০ ওভার শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়িয়েছিল ৯ উইকেটে ১৩৪!
বাংলাদেশকে বলা হয় বাঁহাতি স্পিনারের খনি। ক্লাব কিংবা ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রতিটা দলেরই বোলিং পরিকল্পনার একটা বড় অংশ জুড়ে থাকেন বাঁহাতি স্পিনাররা। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এই বাঁহাতি স্পিন বিপ্লবের অন্যতম পথিকৃৎ হলেন মোহাম্মদ রফিক। একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের উঠতি স্পিনাররা একেকজন রফিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। এনামুল হক জুনিয়র, আব্দুর রাজ্জাক, মোশাররফ রুবেল, প্রয়াত মাঞ্জারুল ইসলাম রানা, সাকিব আল হাসানদের আদর্শ ছিলেন এই রফিক। শুধুমাত্র রফিকদের কারণে আজও বাংলাদেশের ক্রিকেটে বাঁহাতি স্পিনারদের পাইপলাইনটা বেশ মজবুত।
মোহাম্মদ রফিক কেবল দেশসেরা স্পিনারই ছিলেন ন??, দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছিল তার মুখর পদচারণা। ধ্রুপদী বাঁহাতি স্পিনের ঘূর্ণিজাদুতে বিশ্বের অনেক নামীদামি ব্যাটসম্যানকে ঘোল খাইয়েছেন তিনি। বিশ্বের সর্বকালের সেরা বাঁহাতি স্পিনারদের ছোট্ট তালিকাতেও মোহাম্মদ রফিকের নামটা তাই ওপরের দিকেই থাকবে।
রফিকের বোলিংয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ধারাবাহিকতা। দুর্দান্ত অ্যাকুরেসির সাথে ফ্লাইট ও লুপের বৈচিত্র্য দিয়ে ব্যাটসম্যানদের বোকা বানাতেন তিনি। উইকেট থেকে সামান্যতম সাহায্য পেলেই আদায় করে নিতেন পর্যাপ্ত টার্ন ও বাউন্স। ব্যাটসম্যানদের প্রায়ই 'বিগ শট' খেলতে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করতেন তিনি, যেন তারা ধৈর্য হারিয়ে ভুল করতে বাধ্য হয়। এ কারণে মাঝেমধ্যে হয়ত তিনি কিছু রান বেশি দিয়ে ফেলতেন। তবুও নিজের সামর্থ্যের উপর কখনও আস্থা হারাতেন না।
রফিকের বোলিংয়ের সেরা অস্ত্রটি ছিল আর্ম বল। আপাত নিরীহদর্শন এই ডেলিভারিটাই কখনও কখনও ব্যাটসম্যানদের জন্য হয়ে উঠত এক অজানা আতঙ্কের নাম। মনে আছে ২০০৮ সালে ঢাকায় হাশিম আমলা ও জ্যাক ক্যালিসকে প্রায় একই রকম দুটো আর্মারে বিভ্রান্ত করে আউট করেছিলেন রফিক। রফিকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম উইকেটটাও তো এসেছিল আর্ম বলেই।
মজার ব্যাপার হল, শুরুতে রফিক ছিলেন একজন বাঁহাতি পেসার। পেশাদার ক্রিকেট খেলাও শুরু করেন সেই পেসার হিসেবেই। ১৯৮৫ সালে দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট অংশ নেন বাংলাদেশ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে।
সেখানে তিন বছর খেলার পর ১৯৮৮ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ বিমানে। বিমানে খেলার সময় সতীর্থ পাকিস্তানী ক্রিকেটার ওয়াসিম হায়দারের পরামর্শে পেস বোলিং ছেড়ে স্পিন করতে আরম্ভ করেন রফিক। স্পিন যে একদমই পারতেন না তা কিন্তু নয়। নেটে মাঝেমধ্যেই স্পিন করতেন। টার্নও পেতেন বেশ ভাল। এভাবেই রফিকের সাধারণ পেসার থেকে একজন বিশ্বমানের স্পিনার হয়ে ওঠার শুরু।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রায় সবকটি অর্জনের সাথেই জড়িয়ে আছে রফিকের নাম। ঐতিহাসিক আইসিসি ট্রফি জয় থেকে শুরু করে প্রথম ওয়ানডে, প্রথম টেস্ট, প্রথম টি২০ সবগুলো জয়েই একমাত্র সাক্ষী ছিলেন রফিক।
১৯৯৪ সালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের জার্সি গায়ে চাপিয়েছিলেন রফিক। ভারত ‘এ’ দলের বিপক্ষে ২৫ রান দিয়ে নিয়েছিলেন ৩ উইকেট। আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিল অবশ্য পরের বছরই। ১৯৯৫ সালে শারজায় ভারতের বিপক্ষে। সে ম্যাচে ব্যাট হাতে মাত্র ২ রান করলেও বল হাতে নিয়েছিলেন শচীন টেন্ডুলকারের মহামূল্যবান উইকেট।
উল্লেখ্য, শচীনকে ওয়ানডেতে ২ বার আর টেস্টে ১ বার আউট করেছেন রফিক।
১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফির জয়ের অন্যতম নেপথ্য কারিগর ছিলেন রফিক। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে বল হাতে দেখিয়েছিলেন অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা। ৯ ম্যাচ খেলে মাত্র ১০.২৫ গড়ে নিয়েছিলেন ১৯ উইকেট! বল হাতে সেরা পারফরম্যান্স ছিল সেমিফাইনালে স্কটিশদের বিপক্ষে জয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়া ২৫ রানে ৪ উইকেট। কেনিয়ার বিপক্ষে ফাইনালেও নিয়েছিলেন ৩ উইকেট আর ওপেনিংয়ে নেমে খেলেছিলেন ১৫ বলে ২৬ রানের একটি অসাধারণ 'ক্যামিও'। যা বাংলাদেশকে এনে দিয়েছিল উড়ন্ত সূচনা। তুমুল উত্তেজনাপূর্ণ ও নাটকীয়তায় ভরা ম্যাচটির নিষ্পত্তি হয়েছিল শেষ বলে।
১৯৯৮ সালের ১৭ মে, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ওয়ানডে জয়টি এসেছিল ভারতের হায়দ্রাবাদে, কেনিয়ার বিপক্ষে। আগের ছয়বারের সাক্ষাতে কখনোই জিততে না পারা বাংলাদেশ কেনিয়াকে হারিয়েছিল সপ্তমবারের প্রচেষ্টায়। আর সেটা সম্ভব হয়েছিল কেবলমাত্র রফিকের অলরাউন্ড নৈপুণ্যের সুবাদে। কেনিয়ার দেওয়া ২৩৭ রানের টার্গেটে ওপেন করতে নেমে রফিক খেলেছিলেন ১১টি চার ও ১টি ছক্কায় সাজানো ৮৭ বলে ৭৭ রানের 'দুঃসাহসিক' এক ইনিংস। পাশাপাশি বল হাতে ৫৬ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কারটাও জিতে নিয়েছিলেন রফিক।
২০০০ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট অভিষেকে রফিক নিয়েছিলেন ৩ উইকেট আর ব্যাট হাতে করেছিলেন ২৬ রান। উল্লেখ্য, টেস্টে রফিকের প্রথম শিকার ছিলেন 'দ্য ওয়াল খ্যাত রাহুল দ্রাবিড়।

২০০৩ সালের মে মাসে ঢাকায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করেছিলেন রফিক। ৭৭ রানে নিয়েছিলেন ৬ উইকেট যা ছিল টেস্টে বাংলাদেশের পক্ষে সেরা বোলিংয়ের তৎকালীন রেকর্ড।
২০০৩ সালের ডিসেম্বরে তিন টেস্টের সিরিজ খেলতে পাকিস্তান সফরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। পুরো সিরিজ জুড়েই দুর্দান্ত বোলিং করা রফিক মাত্র ২৩ গড়ে নিয়েছিলেন ১৭ উইকেট। ইনিংসে ৫ উইকেট পেয়েছিলেন দুবার।
উল্লেখ্য, ঐতিহাসিক মুলতান টেস্টে সুযোগ পেয়েও উমর গুলকে রান আউট না করার মধ্য দিয়ে ক্রিকেট মাঠে স্পোর্টসম্যানশিপের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন রফিক।
২০০৪ সালে সেন্ট লুসিয়ার গ্রস আইলেটে টেস্ট ক্যারিয়ারের একমাত্র সেঞ্চুরিটি হাঁকিয়েছিলেন রফিক। স্বাগতিক উইন্ডিজের বিপক্ষে ৯ নম্বরে নেমে খেলেছিলেন ১১ চার ও ৩ ছক্কায় সাজানো ১৫২ বলে ১১১ রানের অনবদ্য এক ইনিংস। রফিকের সেঞ্চুরিটাই সেদিন বাংলাদেশকে মহামূল্যবান লিড এনে দিয়েছিল।
২০০৫ সালে চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়েও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন রফিক। প্রথম ইনিংসে ৯৮ বলে ৬৯ রানের চমৎকার এক ইনিংস খেলার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও অপরাজিত ছিলেন ১৪ রানে। জিম্বাবুয়ের প্রথম ইনিংসে ৪১.৪ ওভার বল করে মাত্র ৬৫ রানে ৫ উইকেট নিয়ে দলকে বড় লিড পাইয়ে দিতেও সাহায্য করেছিলেন।
টেস্টের পর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়েও ছিল রফিকের অবদান। সিরিজ নির্ধারণী পঞ্চম ওয়ানডের 'ম্যাচসেরা' রফিক ওপেনিংয়ে নেমে উপহার দিয়েছিলেন ৬৬ বলে ৭২ রানের একটি বিস্ফোরক ইনিংস। ৭টি চারের পাশে ছক্কা ছিল ৪টি!
২০০৫ সালের কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাওয়া সেই ঐতিহাসিক জয়ের পেছনেও একটা বড় ভূমিকা রেখেছিল রফিকের নিয়ন্ত্রিত বোলিং (১০-০-৩১-০) এবং ম্যাচের শেষদিকে মারা মহামূল্যবান দুটি বাউন্ডারি শট।
২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আয়োজিত 'সুপার' সিরিজে বিশ্ব একাদশের স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছিলেন তিনি। অবশ্য একটি ম্যাচেও খেলার সুযোগ হয় নি তার।
টেস্টে বল হাতে রফিকের সেরা সাফল্যটি এসেছিল ২০০৬ সালে, ফতুল্লায়। রফিকের অসাধারণ বোলিংয়ে সেবার টেস্ট জয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। দুই ইনিংস মিলিয়ে রফিকের শিকার ছিল ৯ উইকেট। প্রথম ইনিংসে ৬২ রানে ৫ উইকেট লাভের পর দ্বিতীয় ইনিংসে নিয়েছিলেন ৯৮ রানে ৪ উইকেট।
পরের ম্যাচটা ছিল চট্টগ্রামে। যে ম্যাচে শেন ওয়ার্ন-স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলদের রীতিমতো পাড়ার বোলার বানিয়ে ইচ্ছেমত পিটিয়েছিলেন রফিক। ৫৩ বলে ৬৫ রানের বিধ্বংসী এক ইনিংস খেলার পথে মেরেছিলেন ৬টি বিশাল ছক্কা!
২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে সেই ইতিহাস গড়া জয়েও ছিল রফিকের অবদান। ১০ ওভার বোলিং করে মাত্র ৩৮ রানে নিয়েছিলেন 'মহামূল্যবান' ৩টি উইকেট। রফিকের শিকার উইকেটগুলো ছিল যথাক্রমে অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড়, মহেন্দ্র সিং ধোনি এবং ম্যাচের টপ স্কোরার সৌরভ গাঙ্গুলির। এছাড়া সুপার এইট পর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয়েও বল হাতে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্পেল (১০-২-২২-১) করেছিলেন রফিক।
২০০৭ সালের আফ্রো-এশিয়া কাপে এশিয়া একাদশের হয়ে ২টি ম্যাচে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন রফিক। ২০০৭ সালের ১০ জুন, আফ্রিকা একাদশের বিপক্ষে খেলা ম্যাচটিই রফিকের ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক ওয়ানডে। উল্লেখ্য, সেদিন ১০ ওভার বোলিং করে ৬৫ রানে ৪ উইকেট নিয়ে রফিকই ছিলেন ম্যাচের সেরা বোলার।
২০০৮ সালে চট্টগ্রামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ দিয়েই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন রফিক। উল্লেখ্য, সেই ম্যাচেই প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে টেস্টে ১০০ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি। রবিন পিটারসনকে স্লিপে জুনায়েদ সিদ্দিকীর ক্যাচ বানিয়ে নিজের ১০০তম শিকারে পরিণত করেছিলেন রফিক।
আসুন এক নজরে দেখে নিই মোহাম্মদ রফিকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার পরিসংখ্যান।
#টেস্টঃ
৬৩ ইনিংসে ১৮.৫৯ গড়ে রফিক রান করেছেন ১০৫৯। ১টি সেঞ্চুরির সঙ্গে হাফ সেঞ্চুরি আছে ৪টি। ক্যারিয়ার সেরা ১১১ রান, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে।
বল হাতে ৩৩ ম্যাচে ৪০.২৬ গড়ে তাঁর উইকেটসংখ্যা ১০০টি। ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন ৭ বার। ক্যারিয়ার সেরা বোলিং ৭৭ রানে ৬ উইকেট, বিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা।
#ওয়ানডেঃ
১০৬ ইনিংসে ১৩.৪৮ গড়ে রফিকের সংগ্রহ ১১৯৯ রান। স্ট্রাইক রেট ৭৩.৬১। অর্ধশতক হাঁকিয়েছেন ২টি। সর্বোচ্চ ৭৭ রান, কেনিয়ার বিপক্ষে।
বল হাতে ১২৫ ম্যাচে ৩৭.৯ গড়ে উইকেট নিয়েছেন ১২৫টি। ইকোনমি রেট ৪.৪৩। সেরা বোলিং ৪৭ রানে ৫ উইকেট, বিপক্ষ কেনিয়া।
#আন্তর্জাতিক টি২০ঃ
২০০৬ সালে খুলনায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টি২০ ম্যাচে রফিকের ব্যাট থেকে এসেছিল ৫ বলে ১৩ রান। এছাড়া ৪ ওভার বল করে ২২ রান দিয়ে নিয়েছিলেন ১ উইকেট।
#ফার্স্টক্লাসঃ
৬২টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলে রফিকের সংগ্রহ ১৭৪৮ রান। একটি সেঞ্চুরির পাশে হাফ সেঞ্চুরি আছে ৯টি। উইকেট নিয়েছেন ২৩৭টি।
#রেকর্ডঃ
★ আইসিসি র্যাংকিংয়ে শীর্ষ ৫০ এ স্থান পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি বোলার হলেন মোহাম্মদ রফিক।
★ প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে টেস্ট ও ওয়ানডে দুই ফরম্যাটেই ১০০ উইকেট লাভ করেন তিনি।
★ প্রথম বাংলাদেশি খেলোয়াড় হিসেবে টেস্ট ও ওয়ানডে দুই ফরম্যাটেই ১০০ উইকেট ও ১০০০ রানের 'অলরাউন্ডার'স ডাবল' অর্জন করেন তিনি।
★ টেস্টে বাংলাদেশের পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (১০০ উইকেট) উইকেট সংগ্রাহক হলেন রফিক।
★ ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পক্ষে সবচেয়ে মিতব্যয়ী বোলিং স্পেলের তালিকায় (সেরা স্পেল সাকিবের ১০-৪-১১-৩) দ্বিতীয় স্থানে আছেন মোহাম্মদ রফিক। ২০০৬ সালে চট্টগ্রামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে রফিকের স্পেলটি ছিল ১০-১-১৩-০!
★ ওয়ানডেতে ৯টি ভিন্ন ভিন্ন পজিশনে ব্যাট করেছেন এমন 'বিরল' রেকর্ডের অধিকারী ক্রিকেটারদের একজন হলেন আমাদের রফিক। ওয়ানডেতে '৪ নম্বর' বাদে সব পজিশনেই খেলেছেন তিনি।
#সম্মাননাঃ
★ ২০০৪ সালে 'বিসিবি ক্রিকেটার অব দ্য ইয়ার' পুরস্কার লাভ করেন।
★ ২০০৫ সালে যৌথভাবে 'বিসিবি বোলার অব দ্য ইয়ার' ও 'বিসিবি অলরাউন্ডার অব দ্য ইয়ার' পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।
টেস্টে ১০০ ও ওয়ানডেতে ১২৫ উইকেট নেওয়া রফিকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার যেন একটি আক্ষেপের গল্প। ক্যারিয়ারের নব্বই ভাগ টেস্ট ম্যাচেই তিনি দ্বিতীয় ইনিংসে বল করার সুযোগ পাননি। অথচ টেস্টে স্পিনারদের জন্য সবচেয়ে বেশি উইকেট পাবার সম্ভাবনা থাকে দ্বিতীয় ইনিংসেই! নিয়মিত দুই ইনিংসে বোলিং করতে পারলে অন্তত শ’দুয়েক টেস্ট উইকেট লেখা থাকত রফিকের নামের পাশে।
একটা সময় রফিকের নামের পাশে জুড়ে দেয়া হয়েছিল ওয়ানডে স্পেশালিষ্টের তকমা। রফিককে শুধু ওয়ানডে খেলিয়ে টেস্টে খেলানো হত আরেক বাঁহাতি স্পিনার এনামুল হক মনিকে। কারণ নির্বাচকদের মতে দুজন বাঁহাতি স্পিনার নাকি একসাথে খেলানো যাবে না টেস্টে!
শুধু তাই নয়, ব্যাটসম্যান হিসেবেও রফিকের সঠিক মূল্যায়ন করা হয় নি কোনদিন। একথা মানতেই হবে যে রফিক তাঁর ১২ বছরের ক্যারিয়ারে পর্যাপ্ত ব্যাটিংয়ের সুযোগ পান নি। টপ অর্ডারে না হলেও অন্তত মিডল অর্ডারে নিয়মিত খেলার যোগ্যতা তাঁর ছিল। এই সুযোগের অভাবেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রফিকের বোলার সত্তাকে ছাপিয়ে অলরাউন্ডার সত্তাটি ঠিক মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে নি। রফিকের সহজাত আগ্রাসন ও পিঞ্চ হিটিং অ্যাবিলিটিকে ঠিকঠাক কাজে লাগানো গেলে একজন অলরাউন্ডার হিসেবে হয়ত আরো উঁচু আসনে বসতে পারতেন রফিক।
বাংলার ক্রিকেটপাগল মানুষের কাছে লাল সবুজের জার্সি গায়ে রফিক ছিলেন একটি সম্ভাবনার নাম, একটি ভরসার নাম। ঢাকার ঘরোয়া ক্রিকেটে মাঠ কাঁপানো সেরা সময়ের রফিকের খেলা যারা স্বচক্ষে দেখেছেন, তাদের অনেকে কাছে রফিকই বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার। সত্যি বলতে বাংলাদেশের ক্রিকেটে রফিকের মত এত বড় মাপের প্লেয়ার খুব কমই এসেছেন। ব্যাটিং, বোলিং কিংবা ফিল্ডিং যেটাই করুন না কেন সামর্থ্যের শতভাগ উজাড় করে দিতেন সবসময়। প্রতিটি রান, প্রতিটি উইকেটের জন্য লড়তেন জানপ্রাণ দিয়ে। তাই শুধুমাত্র রান আর উইকেটের পরিসংখ্যান দিয়ে আর যাই হোক, রফিকের মত খেলোয়াড়ের 'গ্রেটনেস' বোঝানো সম্ভব নয়।